দক্ষিণ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, আনোয়ারা, পটিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ শাহ আমানত সেতু, যা স্থানীয়ভাবে নতুন ব্রিজ নামে পরিচিত। প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচলে ব্যস্ত এই সেতুর প্রবেশমুখসংলগ্ন নোমান কলেজ রোডের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক পদার্থের ড্রাম সংরক্ষণ ও বেচাকেনার অভিযোগ উঠেছে ‘আমজাদ এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে। আবাসিক এলাকার মধ্যে এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থভর্তি ড্রাম ধোয়া ও পরিষ্কারের পর বর্জ্যপানি স্থানীয় নালার মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ার অভিযোগে পরিবেশদূষণের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জনবসতিপূর্ণ এলাকার আশপাশে রাসায়নিক পদার্থভর্তি ড্রাম সংরক্ষণ ও কেনাবেচার ফলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এসব ড্রাম থেকে রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়া, তীব্র দুর্গন্ধ, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্ক ব্যক্তি ও আশপাশের বসবাসকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিতে রাসায়নিক পদার্থভর্তি ড্রাম ধোয়া ও পরিষ্কার করার পর সৃষ্ট দূষিত পানি এবং রাসায়নিক বর্জ্য স্থানীয় নালায় ফেলা হচ্ছে। সেখান থেকে এসব বর্জ্য কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে মিশছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এতে নদীর পানির গুণগত মান, জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে নদীর পানিতে রাসায়নিক দূষণের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে নমুনা পরীক্ষা ও পরিবেশগত তদন্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে দৈনিক অর্থনীতির রিপোর্টার এনি আমজাদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আমজাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমার প্রতিষ্ঠানটির এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন নেই, আমি এইভাবেই ব্যবসা চালিয়ে যাব। তিনি সাংবাদিকদের আপত্তিকরভাবে কথাবার্তাও বলেন। তাঁর এই বক্তব্যের পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বৈধতা, রাসায়নিক পদার্থের প্রকৃতি এবং সেগুলো সংরক্ষণ ও পরিষ্কারের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আমজাদ এন্টারপ্রাইজের নামে পরিবেশগত কোনো অনুমোদন নেই। প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তাঁরা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা জমির উদ্দিন বলেন, “এভাবে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের ড্রাম রাখায় তীব্র দুর্গন্ধ ও বিস্ফোরণের আতঙ্কের মধ্যে সন্তানদের বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। রাস্তার পাশে এসব রাসায়নিকের ড্রাম রাখার কারণে আমাদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আবু হানিফ বলেন, “রাসায়নিক পদার্থভর্তি এসব ড্রামের কারণে পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব ড্রাম ধোয়া ও পরিষ্কারের বর্জ্য যদি নালা দিয়ে নদীতে যায়, তাহলে কর্ণফুলী নদীর পানি ও পরিবেশের ক্ষতি হবে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
এলাকার শিক্ষার্থীরাও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সময় রাসায়নিক পদার্থের ড্রামের পাশ দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে তীব্র গন্ধের মধ্যে থাকতে হচ্ছে তাদের। দীর্ঘ সময় এ ধরনের পরিবেশে চলাচল করলে স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ সংরক্ষণ ও কেনাবেচা করা হচ্ছে, সেগুলোর ঝুঁকির মাত্রা কতটুকু এবং ড্রামগুলো কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে রাখা হয়েছে, তা দ্রুত তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নদীতে দূষিত পানি যাওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ চান স্থানীয় বাসিন্দারা।
অন্যদিকে নোমান কলেজ রোডের অব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি স্থানীয়দের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হলেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, নালা নিয়মিত পরিষ্কার না করা, ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। জমে থাকা ময়লা ও কাদাযুক্ত পানিতে পথচারী, শিক্ষার্থী ও অটোরিকশাচালকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, রাসায়নিক পদার্থের বর্জ্য যদি নালার পানির সঙ্গে মিশে নদীতে গিয়ে পড়ে, তাহলে জলাবদ্ধতার সময় দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সড়কের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিবেশ ও জননিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, রাসায়নিক পদার্থ সংরক্ষণ, পরিবহন, ড্রাম পরিষ্কার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ঝুঁকি ও জননিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো দুর্ঘটনা কিংবা বড় ধরনের পরিবেশগত ক্ষতি ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের পাশে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, আমজাদ এন্টারপ্রাইজের কার্যক্রম সরেজমিনে তদন্ত, রাসায়নিক পদার্থের নমুনা পরীক্ষা, বর্জ্য নিষ্কাশনের পথ শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে নোমান কলেজ রোডের জলাবদ্ধতা ও নাগরিক অব্যবস্থাপনা দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ চান তাঁরা।