ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে অর্থনৈতিক লেনদেনের গতি-প্রকৃতিতে দেখা দিয়েছে এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। একদিকে নির্বাচনি প্রচার, মাঠপর্যায়ের ব্যয় ও ভোটকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে নগদ অর্থের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে; অন্যদিকে অবৈধ লেনদেন ও ভোট কেনাবেচা ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আরোপ করেছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ইন্টারব্যাংক লেনদেনে ৯৬ ঘণ্টার কঠোর বিধিনিষেধ।
ফলে ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে অর্থপ্রবাহে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘কৃত্রিম সংকোচন’। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক মাঠ, গ্রামীণ অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত, এমএফএস এজেন্ট, গার্মেন্টস শ্রমিক এবং সাধারণ গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেনে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ও বড় শহর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছেন। যাতায়াত ব্যয়, পারিবারিক খরচ ও স্থানীয় বাজারে কেনাকাটার কারণে নগদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণা, কর্মী ব্যবস্থাপনা, যানবাহন, আপ্যায়ন ও সাংগঠনিক খাতে ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে নির্বাচনি মাঠে নগদের প্রবাহ বেড়েছে দ্রুতগতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। জানুয়ারিতে ব্যাংকের বাইরে নগদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি নির্বাচনি অর্থচক্রের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। স্থানীয় বাজার, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় লেনদেন বেড়েছে। ব্যাংকিং সূত্র জানায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহেও সাময়িক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৯ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত ৯৬ ঘণ্টা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যক্তিগত হিসাবের লেনদেন সীমিত রাখা হয়েছে। প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা এবং দিনে সর্বোচ্চ ১০ বার লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একজন গ্রাহক দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন।
এ ছাড়া ইন্টারব্যাংক ইনস্ট্যান্ট ট্রান্সফার (আইবিএফটি) সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে এবং এনপিএসবি আওতাধীন ব্যক্তি-টু-ব্যক্তি লেনদেনেও সীমা আরোপ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় অবৈধ অর্থপ্রবাহ, ভোট কেনাবেচা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) নগদ লেনদেনে নজরদারি জোরদার করেছে। এক দিনে কোনো হিসাবে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি জমা বা উত্তোলনের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলের বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনও বিশেষ নজরদারির আওতায় এসেছে।
নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার প্রভাব পড়েছে সাধারণ গ্রাহক, এমএফএস এজেন্ট ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর। অনেক গার্মেন্টস শ্রমিক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বেতন পেলেও ক্যাশ আউট সীমিত থাকায় হাতে নগদ পাচ্ছেন না। এতে বাজার করা, বাড়ি ভাড়া দেওয়া কিংবা গ্রামে টাকা পাঠাতে সমস্যায় পড়েছেন তারা।
অন্যদিকে কমিশননির্ভর এমএফএস এজেন্টদের লেনদেন কমে যাওয়ায় আয় প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে।
নির্বাচনি কার্যক্রমে যুক্ত বিভিন্ন আসনের সমন্বয়কারীরা জানান, বর্তমান বিধিনিষেধের কারণে প্রচার-প্রচারণা ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় অর্থ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের ধার করে খরচ চালানোর পরামর্শ দিতে হচ্ছে।
১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি এবং পরবর্তী সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা চার দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে এটিএমে পর্যাপ্ত নগদ রাখার নির্দেশ দিলেও অতীত অভিজ্ঞতায় কিছু এলাকায় নগদ সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট কেনাবেচার অভিযোগও উঠেছে। বগুড়ায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে নগদ অর্থ ও খাবার বিতরণ করে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। অপরদিকে বিএনপি পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়েছে।
প্রদা/ডিও







