যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্ত হওয়া ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ সংক্রান্ত শর্ত বাংলাদেশের বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শর্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশ চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কিংবা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তিতে যেতে পারবে না।
তাঁরা বলছেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক বাণিজ্য কৌশলেও। বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (আরসিইপি)-এ যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ, আরসিইপির সদস্য চীন এবং এই জোটে প্রবেশ করতে হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পৃথক চুক্তি প্রয়োজন হয়।
‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ ধারা কী বলছে
চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি কোনো ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ দেশের সঙ্গে নতুন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তিতে প্রবেশ করে এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল জারি করা নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্ক পুনর্বহাল করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইতোমধ্যে চীন ও রাশিয়াসহ ভিয়েতনাম, বেলারুশ, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, মলদোভা ও আজারবাইজানকে ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
৩৭ শতাংশ শুল্কের ঝুঁকি
চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ যদি এসব দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের এপ্রিলে আরোপ করা ৩৭ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্ক পুনর্বহাল করতে পারবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান এসব শর্ত বিশ্লেষণ করে জানান, এই ধারা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করবে।
রূপপুর প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ
চুক্তির আরেকটি ধারা পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানি করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থের পরিপন্থী। তবে বিকল্প সরবরাহকারী না থাকলে বা চুক্তি কার্যকরের আগে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় বিদ্যমান চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
এই বিষয়ে মোস্তফা আবিদ খান বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় উপকরণ আনা যাবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের হাত-পা অনেকটাই বাঁধা পড়ে গেছে।”
বিনিয়োগে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব
মো. হাফিজুর রহমান জানান, চুক্তির বিনিয়োগসংক্রান্ত ধারায় বলা হয়েছে—তৃতীয় কোনো দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে রপ্তানি করলে যুক্তরাষ্ট্র ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য কোনো দেশে কম দামে পণ্য রপ্তানির কারণে যদি কোনো মার্কিন কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রেও বাংলাদেশে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে চীনসহ কম উৎপাদন খরচের সুবিধা নিতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বিদেশি উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
মার্কেট রেট নির্ধারণ প্রসঙ্গে মোস্তফা আবিদ খান বলেন, এই রেট যুক্তরাষ্ট্রই নির্ধারণ করবে। নব্বইয়ের দশকে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সময় যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন খরচের সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা যোগ করে বাজারমূল্য নির্ধারণ করেছিল—এমন নজির রয়েছে।
শুল্কছাড় ও রাজস্বের চ্যালেঞ্জ
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাকে শূন্য রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ সুবিধা পাবে বাংলাদেশ—যা ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে।
তবে এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর একযোগে প্রায় ৫০ শতাংশ শুল্ক কমানো হয়েছে। এর মধ্যে কাস্টমস শুল্কের পাশাপাশি সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রক শুল্কও অন্তর্ভুক্ত। কেবল ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর বহাল থাকবে।
হাফিজুর রহমানের মতে, এতে সরকারের রাজস্ব আদায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
মেধাস্বত্বে বাড়তি চাপ
চুক্তির আওতায় মেধাস্বত্ব অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ১৩টি নতুন চুক্তি ও কনভেনশনে স্বাক্ষর করতে হবে, যেগুলো ডব্লিউটিওর বিদ্যমান কাঠামোর বাইরে। এসব চুক্তি বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতিকে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি স্বল্পমেয়াদে কিছু রপ্তানি সুবিধা আনলেও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বাণিজ্য কৌশল, বিনিয়োগ পরিবেশ ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক সুবিধা ও সার্বভৌম বাণিজ্য স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রদা/ডিও






