প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর নেতারা এই উদ্বেগের কথা জানান।
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে এবং আগামীকাল থেকে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহারে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে এই ধর্মঘট শুরু হলে দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর নেতারা এই উদ্বেগের কথা জানান।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বিইএফ সভাপতি ফজলে করিম এহসান, বিজিএমইএ-র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এবং বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
ব্যবসায়ী নেতারা চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘জাতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, দেশের মোট কন্টেইনার যাতায়াতের ৯৯ শতাংশ এবং সমুদ্রপথের বাণিজ্যের ৭৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বন্দরে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে। এছাড়া রমজান মাসের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে।
তারা আরও সতর্ক করেছেন যে, বন্দরে জাহাজ জট এবং পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে আমদানিকারকদের বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ গুনতে হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
চিঠিতে ব্যবসায়ী নেতারা ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রশংসা করেন। তবে তারা জানান, বন্দরের এই ‘গভীর অচলাবস্থা’ তাদের চরম উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
সংকটের মূলে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে শ্রমিক-কর্মচারীরা আগামীকাল ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টার্মিনাল এবং আউটার অ্যাঙ্করেজে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ও কাজ বন্ধের ডাক দিয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত সাত দিন ধরে বিভিন্ন অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় সভা হলেও কোনো সমাধান আসেনি। বরং আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্ত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেকোনো ধরনের ব্যাঘাত আমাদের কারো জন্যই কাম্য নয়।’
তারা প্রধান উপদেষ্টাকে শ্রমিক, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমঝোতা তৈরির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
উল্লেখ্য, নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সাথে আলোচনার পর শ্রমিকরা ৪৮ ঘণ্টার জন্য ধর্মঘট স্থগিত করেছিল। কিন্তু লিজ বাতিল, বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা পুনরায় ধর্মঘটে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বদলি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের ভয় দেখিয়ে ‘অসদাচরণ’ করছে।
রপ্তানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, এই ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে বিদেশের বাজারে অর্ডার বাতিল, শিপমেন্টে বিলম্ব এবং শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ এই ধর্মঘটকে জাতীয় বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যা উভয় পক্ষকে আরও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের এই সংবেদনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপই একমাত্র সমাধান হতে পারে বলে মনে করছে ব্যবসায়ী সমাজ।
প্রদা/ডিও







