আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি থেমে নেই। বরং নানা কৌশলে বৈশ্বিক বাজারে তেল বিক্রি অব্যাহত রেখেছে দেশটি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে সামনে এসেছে চীন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই কিনছে চীন। ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে চীন যত অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, তার প্রায় ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ এসেছে ইরান থেকে। তবে এসব লেনদেন সাধারণত ডলারের মাধ্যমে হয় না; বরং চীনা মুদ্রা ইউয়ানে মূল্য পরিশোধ করা হয় এবং অনেক সময় তা ঘুরপথে সম্পন্ন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলার ব্যবহার না করায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নজর এড়ানো সহজ হয় এবং একই সঙ্গে চীনের জন্যও এটি অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাগনাম ফিনভেস্ট সার্ভিসেসের বিশ্লেষক সৌরভ জৈন জানান, এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চীনের অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একটি ব্যাংক—ব্যাংক অব কুনলুন।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই ব্যাংকটি মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন সম্পন্ন করে। ইরান-চীন তেল বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ এবং সেই অর্থ পুনরায় চীনের বাজারে প্রবাহিত করার প্রক্রিয়ায় এই ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ইরানের তেল সরাসরি ইরানি তেল হিসেবে চীনে প্রবেশ করে না। উৎস গোপন রাখতে কখনো কখনো অন্য দেশের তেল হিসেবে পরিচয় দিয়ে জাহাজে করে তা চীনে আনা হয়। নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ইরান ইউয়ানে অর্থ গ্রহণ করায় সেই অর্থ মূলত চীনের বাজারেই ব্যয় করতে বাধ্য হয়। ফলে ইরান চীন থেকে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, শিল্প উপকরণ ও অবকাঠামোগত সামগ্রী কিনে থাকে। এতে করে তেলের বিপরীতে দেওয়া অর্থ আবার চীনের অর্থনীতিতেই ফিরে আসে।
তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের হিসাবে, ২০২৪ সালে তেল রপ্তানি থেকে ইরানের আয় হয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের তেল গেছে চীনে। ফলে ইরানের জ্বালানি রপ্তানিতে চীন কার্যত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে।
চীনের বাইরে ইরানি তেলের ক্রেতা খুবই সীমিত। সিরিয়া তুলনামূলকভাবে বড় ক্রেতা হিসেবে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি তেল কিনেছে, যা ইরানের মোট রপ্তানির প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভেনেজুয়েলাও অল্প পরিমাণে ইরানি তেল আমদানি করে।
একসময় জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বহু দেশে ইরানের তেল রপ্তানি হতো। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই বাজার অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে।
বর্তমানে ইরান নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পুনর্নিবন্ধিত ট্যাংকার বা তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ব্যবহার করছে। অনেক সময় সমুদ্রের মাঝেই এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে উৎস গোপন রাখা হয়।
দামের দিক থেকেও ইরান প্রতিযোগিতামূলক কৌশল নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের তুলনায় ইরানি অপরিশোধিত তেল সাধারণত প্রতি ব্যারেলে ৩ থেকে ৯ ডলার কম দামে বিক্রি করা হয়। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় এই ছাড় দেওয়া সম্ভব হলেও এর ফলে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার সম্ভাব্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমিতসংখ্যক ক্রেতাকে ধরে রাখার জন্যই ইরানকে এই মূল্যছাড় দিতে হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার চাপে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে এটি কার্যত তেহরানের কৌশলগত সমাধান।







