দেশে চলমান লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ–সংকটের প্রভাব এবার মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় পড়ছে। বিদ্যুৎ গ্রিডের অনিয়মিত সরবরাহে নেটওয়ার্ক পরিচালনা এখন প্রায় পুরোপুরি জেনারেটর–নির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে দৈনিক জ্বালানির চাহিদা বেড়ে প্রায় এক লাখ লিটারে পৌঁছেছে।
মোবাইল অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মোবাইল বেজ ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) চালু রাখতে প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন। এর বাইরে ডেটা সেন্টার ও সুইচিং অবকাঠামো সচল রাখতে আরও ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। তবে ইরান যুদ্ধের পর শুরু হওয়া জ্বালানিসংকটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে এর প্রভাব দ্রুত মোবাইল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা অপারেটরদের।
মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত ডেটা সেন্টারগুলোয় দৈনিক প্রায় ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা আছে। বিদ্যুৎ না থাকলে এসব কেন্দ্র সচল রাখতে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার জ্বালানি লাগে।
মোবাইল অপারেটর কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের ডেটা সেন্টারগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ১১ হাজার ১৮৪ লিটার, রবির ৯ হাজার ৭৩২ লিটার ও বাংলালিংকের ৮ হাজার ২০০ লিটার।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা সাড়ে ১৮ কোটির বেশি। অপারেটরদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটলে প্রথমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়বে। এরপর শহরাঞ্চলেও দেখা দিতে পারে কল ড্রপ, ডেটা স্লোডাউন ও আংশিক নেটওয়ার্ক অচল হওয়ার মতো ঝুঁকি। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালু রাখতে না পারলে নির্দিষ্ট এলাকায় সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে।
বাংলাদেশ টাওয়ারকো অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি ও ইডিওটিসিও বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুনীল আইজ্যাক বলেন, ‘বাংলাদেশের সংযোগ ব্যবস্থার ওপর বাস্তব ও তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, টেলিকম খাত সব ধরনের ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তি। এটিকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।
টাওয়ার কোম্পানিগুলোর রিমোট মনিটরিং সেন্সরের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, গত এক মাসে টাওয়ার সাইটগুলো চাহিদার বিপরীতে কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে ১২টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ৯৩ শতাংশ থেকে কমে ৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
একটি টাওয়ার কোম্পানির কর্মকর্তা বলেন, দেশে হাজার হাজার টাওয়ার পরিচালনা অপারেটররা নিয়মিত কী পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহে মোবাইল অপারেটররা টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অন্তত দুটি চিঠি পাঠিয়ে দেশব্যাপী আসন্ন বিঘ্নের আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তাৎক্ষণিক সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া টেলিকম কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
কারণ দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তারা ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, জানিয়েছে সংস্থাটি।






