মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভোগ্যপণ্যের বাজারে। যুদ্ধকে পুঁজি করে চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলের দাম ওঠানামা করছে। পাশাপাশি বেড়েছে চিনির দাম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। সেদিন বিকেল পর্যন্ত খাতুনগঞ্জে পাম অয়েলের দাম স্বাভাবিক ছিল। তবে যুদ্ধের খবর আসতেই সেদিন রাতে প্রতি লিটার পাম অয়েলের দাম ২ টাকা ৪১ পয়সা বেড়ে যায়। পরদিন ১ মার্চ লিটারে দাম ১ টাকা ২০ পয়সা কমে আসে। ২ মার্চ লিটারে আবারও ৬০ পয়সা বেড়ে যায়। পাশাপাশি পাইকারি বাজারটিতে সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ২ টাকা ৮৯ পয়সা বেড়েছে। একই সময়ের ব্যবধানে চিনির দাম কেজিতে বেড়েছে ১ টাকা ৬০ পয়সা।
বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি লিটার পাম অয়েল ১৪৪ টাকা ৯ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৭৩ টাকা ১৫ পয়সায়। অন্যদিকে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৯৩ টাকায়।
খাতুনগঞ্জের একাধিক পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রমজান মাসের শুরুর দিকে বেচাকেনা ভালোই ছিল। তবে রোজার মাঝামাঝিতে এসে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমে যায়। বেশির ভাগ ব্যবসায়ীকে অলস সময় পার করতে দেখা যায়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাজারে বেচাকেনা কিছুটা বাড়ে। তখন কেউ কেউ পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, আবার কেউ মজুত পণ্য করে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। তাই বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে ব্যয় বাড়বে। তখন এর প্রভাব পড়বে ভোগ্যপণ্যের বাজারে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যের দাম এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের দ্রুত অবসান না ঘটলে ভোগ্যপণ্যের সাপ্লাই চেইন ভেঙে যেতে পারে। তখন সব পণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে।’
সরকারকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘যুদ্ধ চলমান থাকলে আমাদের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়বে। জ্বালানি তেল, গ্যাসের সাপ্লাই মধ্যপ্রাচ্য থেকে হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে। অন্যদিকে জাহাজ চলাচল ঠিকঠাক না করতে পারলে ভোগ্যপণ্যের সংকট সৃষ্টি হবে। দাম বাড়বে। ইতোমধ্যে কিছু লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তাই সরকারের উচিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে আলোচনা করা, পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা।’
তবে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেছেন, ‘রমজানকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণে ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। খাতুনগঞ্জে পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক থাকার কথা। কিন্তু যুদ্ধকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা আগের কেনা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। রমজান এলেই আমাদের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভোজ্যতেল ও চিনির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই বলে আমরা মনে করি।’
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন পাম অয়েল (বাজার মূল্য ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা) ও ৪ লাখ ৬৩ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল (বাজার মূল্য ৬৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা) আমদানি হয়েছে। পাশাপাশি একই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২ লাখ ৬৯ হাজার টন পরিশোধিত চিনি (বাজার মূল্য ১৩ হাজার ২৭ কোটি টাকা) ও ১ লাখ ৭ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি (বাজার মূল্য ৮৮৬ কোটি টাকা) খালাস হয়েছে।
প্রদা/ডিও







