যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর দেশটি থেকে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে বাংলাদেশ। গত সোমবার দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া চুক্তির ‘বাণিজ্যিক সমঝোতা’ অংশের ৬ নম্বর ধারায় এই প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তবে এত বিপুল পরিমাণ আমদানি বাস্তবে কতটা সম্ভব—তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও গবেষকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমদানিকারকেরা বলছেন, বাণিজ্যিক সমঝোতা পূরণ করতে হলে আমদানি করা কৃষিপণ্যের কাঁচামালনির্ভর শিল্পকে সুরক্ষা ও নীতি সহায়তা দিতে হবে। অন্যদিকে গবেষকদের মতে, চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া বিপুলসংখ্যক পণ্যে শুল্কছাড় দিলে রাজস্বে চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বাণিজ্যচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির পর বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কহার ২০ থেকে কমে হয়েছে ১৯ শতাংশ।
বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারের। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৮৬৯ কোটি ডলার। এই বাজারে তৈরি পোশাকই রপ্তানি হয়েছে ৭৫৫ কোটি ডলারের। তার বাইরে হোম টেক্সটাইল, টুপি বা ক্যাপ, জুতা, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদিও রপ্তানি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ২ এপ্রিল দেশটিতে পণ্য রপ্তানিকারক ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এ হারটি ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক তিন মাসের মাথায় ২০২৫ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর-কষাকষির পর ২ আগস্ট এ হার কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে দেশটিতে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। তার সঙ্গে বাড়তি হিসেবে যুক্ত হয় পাল্টা শুল্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশের মধ্যে ভিয়েতনামের পণ্যে ২০, ভারতের ৫০, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার ১৯, শ্রীলঙ্কার ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ হয়েছিল। সম্প্রতি ভারতের শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হয়েছে। তার আগে চীনের শুল্ক কিছুটা কমেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক ছাড়া অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা সীমিত হয়ে আসছে।
শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৬ লাখ ৩৩ হাজার টন সয়াবিনবীজ এনেছে, যা দেশ থেকে মোট আমদানি হিসাবের ২৮ শতাংশ।
গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক কমানোর দর–কষাকষিতে দেশটি থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ সরকার। তারপর দেশটি থেকে তুলা ও খাদ্যশস্যের আমদানি শুরু করে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
সরকারের খাদ্য অধিদপ্তর গম আমদানিতে শীর্ষে, সায়হাম গ্রুপ তুলা আমদানিতে তৃতীয়, আর ডেলটা এগ্রোফুড ও সিটি গ্রুপ সয়াবিনবীজ আমদানে চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত বড় পরিমাণ কৃষিপণ্য আনতে হলে বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা আংশিকভাবে উপেক্ষা করতে হতে পারে। সাধারণত বেসরকারি খাত কম দামে পণ্য আনে, তাই যুক্তরাষ্ট্রমুখী আমদানিতে ভর্তুকি বা বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন হতে পারে, যা নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করছে।
প্রদা/ডিও






