দেশের অর্থনীতি বর্তমানে ঋণাত্মক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতার এক দীর্ঘমেয়াদী চক্রে আটকা পড়েছে। বর্তমানে অর্থনীতি নানামুখী সংকটে জর্জরিত হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ যেমন থমকে গেছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও চলছে চরম মন্দা।
এর ফলে চালু কলকারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলেও জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের কর আদায়ের ওপর। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়িক অবস্থা ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনীতির জন্য সবসময়ই দুঃসংবাদ বয়ে আনে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হলে অর্থনীতি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সংকটের এই ত্রিমুখী চাপে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে চলতি অর্থবছরের শুরুতে যে শ্লথগতি দেখা দিয়েছিল, তার রেশ এখনো কাটেনি।
শিল্প ও বিনিয়োগের এই শোচনীয় অবস্থার জন্য মূলত ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ঋণপ্রবাহের অস্বাভাবিক হ্রাসকে দায়ী করা হচ্ছে। এনবিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ঘাটতি হয়েছে ৪৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে, যার পরিমাণ ২৩ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। এ ছাড়া আমদানি পর্যায়ে ১২ হাজার ১৪০ কোটি এবং ভ্যাট খাতে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজস্ব আয়ের এই নিম্নমুখী চিত্র আগামী দিনে দায়িত্ব নেওয়া রাজনৈতিক সরকারকেও চরম ভোগান্তিতে ফেলবে।
বর্তমানে মানুষের আয় না বাড়লেও সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। বিদায়ী বছরের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি যেখানে ৮.২৯ শতাংশ ছিল, ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়লেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। দেশের উদ্যোক্তাদের মতে, সার্বিক অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ায় প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব কমাটাই স্বাভাবিক। একটি অস্থির সময়ে উচ্চ বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান আশা করা কঠিন, তাই সবাই এখন সামনের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন।
যদিও জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বেকারত্ব দূর করা, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বা শিল্প মন্দা কাটানোর পদক্ষেপগুলো এখনো দৃশ্যমান সুফল বয়ে আনেনি। দেশে বর্তমানে ২৪.০৫ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার, যা দূরীকরণে এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রদা/ডিও






