দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে পচনশীল পণ্য আমদানির আড়ালে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের কারসাজিতে বন্দর এখন রাজস্ব ফাঁকির ‘রামরাজত্বে’ পরিণত হয়েছে। মূলত বন্দরের ৩১ নম্বর শেড ও কাঁচামাল ইয়ার্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট রাতের আঁধারে উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য পাচার করছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘রাজস্ব ফাঁকির রাতের বাজার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গত ছয় মাসেই এই বন্দরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
ঘুষের বিনিময়ে নামমাত্র পরীক্ষণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাছ, ফল ও অন্যান্য পচনশীল পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে ট্রাকে আনা হচ্ছে উচ্চ শুল্কযুক্ত ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ, শাড়ি, থ্রি-পিস এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র। নিয়ম অনুযায়ী শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করার কথা থাকলেও দুর্নীতিবাজ পরীক্ষণ কর্মকর্তারা ট্রাকের উপর থেকে নামমাত্র কয়েকটি কার্টন দেখে ‘ক্লিয়ারেন্স’ দিয়ে দিচ্ছেন। বিনিময়ে পণ্যভেদে ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, শুল্কায়ন গ্রুপ-১ এর কর্মকর্তাদেরও প্রতিটি চালানের জন্য নির্দিষ্ট হারে মাসোহারা দিতে হয়।
নিরাপত্তা ঝুঁকি: অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচার কেবল রাজস্ব ফাঁকি নয়, এই অব্যবস্থাপনার সুযোগে বন্দরে অনুপ্রবেশ করছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। গত ১১ জানুয়ারি র্যাবের অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তলসহ আটক সাকিব হাসান বন্দরের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিল। এর আগে বিজিবি কাঁচা মরিচের ট্রাক থেকে পিস্তল ও ৯৩ রাউন্ড গুলিসহ দুই ভারতীয় নাগরিককে আটক করে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি রাতে দুটি মাছের ট্রাক থেকে ঘোষণা বহির্ভূত প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের সাড়ে ৩ টন ইলিশ মাছ জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ৫ আগস্টের পর শুল্ক ফাঁকির এটিই বড় কোনো চালান আটকের ঘটনা।
কেন বাড়ছে ‘রাতের বাজার’? সংশ্লিষ্টরা জানান, দিনের বেলায় কড়াকড়ি থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পচনশীল পণ্যের নামে অসংখ্য ট্রাক বন্দরে প্রবেশ করে। দ্রুত খালাসের অজুহাতে কোনো প্রকার পরীক্ষণ ছাড়াই ভারতীয় ট্রাক থেকে সরাসরি বাংলাদেশি ট্রাকে মাল তুলে দেওয়া হয় (ট্রানশিপমেন্ট)। দিনের বেলার বৈধ চালানের নথিপত্র ব্যবহার করে রাতের এই অবৈধ পণ্য নিমেষেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
প্রয়োজন স্ক্যানিং ও যৌথ তদারকি আমদানিকারক ও সচেতন মহলের দাবি, বন্দরে বসানো ট্রাক স্ক্যানিং মেশিনটি রহস্যজনক কারণে চালু করা হচ্ছে না। এটি সচল থাকলে এবং প্রতিটি পরীক্ষণে বিজিবি-কে অন্তর্ভুক্ত করা হলে শুল্ক ফাঁকি ‘জিরো টলারেন্সে’ নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
শার্শা উপজেলা দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আক্তারুজ্জামান বলেন, “বিগত সময়ে সন্ধ্যা ৬টার পর পচনশীল পণ্য প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখন তা মানা হচ্ছে না। রাজস্ব আহরণে বিজিবির মতো পেশাদার বাহিনীকে যৌথভাবে নিয়োজিত করা জরুরি।”
বন্দরের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে যশোরের ব্যবসায়ীরা।
প্রদা/ডিও







