চট্টগ্রামে তিনটি আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য দেওয়ায় ৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেন রিটানিং অফিসার ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই), চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৩ (সদ্বীপ) আসনে ১২ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ওই তিন আসনের চার প্রার্থীকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দিতে হয়। অনেক প্রার্থী ভোটারের ভুয়া স্বাক্ষর জালিয়াতি করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-৩ (সদ্বীপ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ১ শতাংশ প্রদত্ত ভোটারের স্বাক্ষরের মধ্যে দৈবচয়নের মাধ্যমে যাচাই করা ১০ জন ভোটারই স্বাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই): মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর আশরাফ সিদ্দিকির মনোনয়নপত্রে প্রয়োজনীয় ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের মধ্যে একজন মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর পাওয়া যায়। বিষয়টি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার পর তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলাম চৌধুরীর দলীয় মনোনয়ন না থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার তথ্যমতে, মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়ে সাত প্রার্থী স্বাক্ষর দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন, যা যাচাই-বাছাইয়ের সময় গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী মোহা. এরশাদ উল্লাহ নিজেই নিজের প্রস্তাবকারী হওয়ায় নির্বাচন বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে তার মনোনয়নও বাতিল হয়।
এদিকে যাচাই-বাছাই শেষে সাত প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৈধ প্রার্থীরা হলেন- বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন, জাতীয় পার্টির সৈয়দ শাহাদাত হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল-রেজি-৪০) শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) একেএম আবু ইউসুফ, ইনসানিয়াত বিপ্লবের রেজাউল করিম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি): আসনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এ যাচাই-বাছাই চলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। যাচাই-বাছাই শেষে আসনের তিন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। অন্য চার প্রার্থীকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এছাড়া তিন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। বাতিল হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন- স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আক্তার, আহম্মদ কবির এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এইচ এম আশরাফ বিন ইয়াকুব। বৈধ প্রার্থীরা হলেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরওয়ার আলমগীর ও জনতার দলের মোহাম্মদ গোলাম নওশের আলী।
এর মধ্যে- জিন্নাত আক্তার প্রদত্ত ১ শতাংশ ভোটারদের মধ্যে দৈবচয়নের মাধ্যমে ১০ জনকে যাচাই করা হয়। এতে আটজনই স্বাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। অর্থাৎ আটজন ভোটারের স্বাক্ষরই অবৈধ বলে প্রমাণিত হয়। ফলে জিন্নাত আক্তারের প্রার্থীতা বাতিল করা হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী আহম্মদ কবিরের মনোনয়নপত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর না থাকায় ১২ (ক-১) ধারা অনুসারে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এছাড়াও, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এইচএম আশরাফ বিন ইয়াকুব দলীয় মনোনয়ন ও হলফনামা না দেওয়ায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
সময় বেঁধে দেওয়া প্রার্থীরা হলেন- সুপ্রিম পার্টির দুই প্রার্থী শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ ও মো. ওসমান আলী এবং গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান।
একই আসনে একই দলের প্রার্থী মো. ওসমান আলী উপস্থিত ছিলেন না। তথ্য ঘাটতি থাকায় তাকেও বিকাল ৪টার মধ্যে উপস্থিত হয়ে তথ্যাবলি সংযুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী রবিউল হাসানের সমর্থনকারীর স্বাক্ষর না থাকায় স্বাক্ষরের জন্য ৪টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে না এলে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে জানানো হয়।
চট্টগ্রাম-৩ (সদ্বীপ): আসনে তিন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিল তিনজন প্রার্থী হলেন- জাতীয় পার্টির প্রার্থী এমএ ছালাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আমজাদ হোসেন। বৈধ প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মোস্তফা কামাল পাশা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আলা উদ্দিন।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী এমএ ছালাম জমা দেওয়া মনোনয়নপত্রে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের চিঠি দাখিল করেছেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জিএম কাদেরের স্বাক্ষরিত প্রার্থীকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে গণ্য হবেন বলে জানানো হয়। রুহুল আমিন হাওলাদারের স্বাক্ষরিত মনোনয়ন দেওয়ায় তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ঋণখেলাপি ও ১ শতাংশ প্রদত্ত স্বাক্ষরের মধ্যে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে যাচাই করা ১০ জন ভোটারই স্বাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন দ্বৈত নাগরিক উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমেরিকান গ্রিনকার্ড দাখিল করেননি। সর্বশেষ ভ্রমণের তথ্যসহ বিকাল ৪টার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয় তাকে। ৪টার আগেই তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়েছেন এবং সেই তথ্য হলফনামায় গোপন করেছেন বলে স্বীকার করে নিলে তার মনোনয়নপত্রটি বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে আমরা বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না। আন্তর্জাতিক মহলে দেখিয়ে দিতে চাই, আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে পারি। সব প্রার্থীদের প্রতি অনুরোধ থাকবে নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত যেন তারা আচরণ বিধি মেনে চলেন।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম-৩ আসনে ১০ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে ৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেন।
প্রদা/ডিও






