ইরান থেকে তেল কেনার অভিযোগে নিজেদের ৫টি রিফাইনারি বা তেল শোধনাগারের ওপর আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, তা কার্যকর হতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন।
গত মাসের শেষের দিকে মার্কিন অর্থ দপ্তর বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এই চীনা শোধনাগারগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা বা লেনদেন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া। এছাড়া যারা এই শোধনাগারগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করবে, তাদেরও জরিমানার মুখে ফেলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল।
শনিবার এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কড়া ভাষায় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নিয়মনীতির সরাসরি লঙ্ঘন’। তারা দাবি করেছে যে, এটি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তৃতীয় কোনো দেশের ব্যবসাকে ‘অন্যায়ভাবে’ সীমিত করার চেষ্টা করছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা মার্কিন পদক্ষেপ ঠেকাতে পাল্টা একটি ‘প্রহিবিশন অর্ডার’ বা নিষেধাজ্ঞা আদেশ জারি করেছে। এই আদেশের ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ‘কোনোভাবেই স্বীকার, প্রয়োগ বা মানা হবে না’। চীন সরকার বলছে, ‘দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের স্বার্থ রক্ষা করতেই’ এই পাল্টা আদেশ দেওয়া হয়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ‘জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া বা আন্তর্জাতিক আইন না মেনে কেবল একতরফাভাবে কারও ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়াকে চীন সরকার কখনোই সমর্থন করে না।’
চীনের নতুন এই আদেশের ফলে হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল (ডালিয়ান) রিফাইনারিসহ মোট ৫টি তেল শোধনাগারের ওপর আমেরিকার জারি করা সব ধরনের বিধিনিষেধ আটকে গেল। বাকি চারটি শোধনাগার মূলত চীনের স্বাধীন ও ছোট আকারের তেল শোধনাগার, যাদেরকে ‘টিপট’ বলা হয়। এগুলো হলো—শানডং জিনচেং পেট্রোকেমিক্যাল গ্রুপ, হেপেই শিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শোউগুয়াং লুচিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংজিং কেমিক্যাল।
গত ২৪ এপ্রিল নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় মার্কিন অর্থ দপ্তর হেংলি পেট্রোকেমিক্যালকে ‘তেহরানের সবচেয়ে বড় গ্রাহক’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তাদের দাবি ছিল, এই শোধনাগারটি কেবল তেল কিনে ইরানি সামরিক বাহিনীর জন্য শত শত কোটি ডলারের রাজস্ব আয় নিশ্চিত করে দিয়েছে।
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন এই একই রকম অভিযোগে চীনের আরও চারটি রিফাইনারি এবং কিছু অন্যান্য স্থাপনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
এমনিতে চীনের চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এর বড় একটি অংশই আসে ইরান থেকে। পণ্যবিষয়ক ডেটা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ইরান বিদেশে যত তেল রপ্তানি করেছে, তার ৮০ শতাংশেরও বেশি একাই কিনেছে চীন।
চীনের এই ‘টিপট’ রিফাইনারিগুলো মূলত স্বাধীন ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। সিনোপেকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোর বিশাল শোধনাগারের তুলনায় এগুলো আকারে ছোট হয়।
তবে দেশের তেলের চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে এই টিপটগুলো চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব শোধনাগার সাধারণত এমন দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল কেনে, যাদের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যেমন—ইরান, রাশিয়া এবং ভেনেজুয়েলা। এসব দেশ থেকে অনেক কম দামে তেল কিনে ফায়দা লোটে টিপটগুলো।
চীনের মোট তেল পরিশোধন ক্ষমতার চার ভাগের এক ভাগই এই টিপটগুলোর হাতে। কিন্তু তারপরও তারা অত্যন্ত সীমিত লাভে, এমনকি মাঝে মাঝে লোকসানেও ব্যবসা করে। সম্প্রতি চীনের নিজস্ব বাজারে জ্বালানির চাহিদা কমে যাওয়ায় এমনিতেই বেশ লোকসানে ছিল এসব শোধনাগার।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিষেধাজ্ঞা তাদের ব্যবসাকে আরও কঠিন করে তুলবে। কারণ এই শোধনাগারগুলোতে তেল পরিশোধনের পর যখন সেটি বিক্রি করার সময় আসবে, তখন সেই পণ্যে ‘অরিজিন’ বা কোথা থেকে তৈরি হয়েছে, তা সঠিকভাবে লেখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে এই কোম্পানিগুলো।






