প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং অবসানের লক্ষ্যে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে তিনি সন্তুষ্ট নন। সোমবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত আলোচনায় উপস্থিত একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রস্তাবটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কী করা হবে, সে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরান বারবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছিল।
ঠিক কী কারণে ট্রাম্প এই প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট, তা স্পষ্ট নয়। তবে তিনি বারবার বলেছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে দেওয়া হবে না।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, যুদ্ধ এবং তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা করে না—আমরা আমাদের সীমারেখা স্পষ্ট করেছি এবং প্রেসিডেন্ট এমন একটি চুক্তিই করবেন, যা আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বের জন্য ভালো হবে।’
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ইরানি প্রস্তাব নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে জোরালো বিতর্ক চলছে। এখানে মূল প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র না ইরান, কার হাতে বেশি প্রভাব রয়েছে এবং এই জলপথ বন্ধ থাকার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ কে বেশি সহ্য করতে পারবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার পাকিস্তানে এই প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। এরপর সোমবার ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বিষয়টি পর্যালোচনা করেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের আরেকটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে নির্ধারিত শান্তি আলোচনা বাতিল করে দেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের আলোচকদের কোনো ছাড় দেওয়ার অনুমতি দেয়নি। এতে সমঝোতা বা শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরান নিজেরাই বুঝতে পারছে না তাদের নেতা কে! তারা কিছুই জানে না! তাদের মধ্যে চরম কোন্দল চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে কট্টরপন্থিরা যারা যুদ্ধক্ষেত্রে শোচনীয়ভাবে হারছে, অন্যদিকে তথাকথিত মধ্যপন্থিরা (যারা মোটেও মধ্যপন্থি নয় কিন্তু গুরুত্ব পাচ্ছে)। এটা সত্যিই পাগলামি!’
পারমাণবিক আলোচনা বিলম্বিত করা হলে তা হয়তো দ্রুত একটি সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারত, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে চাপ কমাতে সাহায্য করত। কিন্তু এ ধরনের বিলম্ব যুদ্ধের একটি বড় লক্ষ্য ব্যর্থ হওয়ার ইঙ্গিত দিত—তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে বাধ্য করা।
প্রণালি পুনরায় খোলার আলোচনাও জটিল হবে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করা। তবে ইরানের হুমকির কারণে—যেখানে টোল না দিলে জাহাজে হামলার কথা বলা হয়েছে—অন্যান্য তেলবাহী জাহাজ চলাচলও ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রণালি খুলতে হলে তাদেরকে জাহাজ থেকে কর বা ফি আদায়ের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জলপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে মিশ্র বার্তা দিয়েছে।
এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে মূলত অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে আরও সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে কি না—এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, আরও দুই মাস অবরোধ চালিয়ে গেলে ইরানের জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে। তেলের কূপ বারবার বন্ধ-চালু করা যায় না, এতে ক্ষতি হয় এবং মেরামতে বড় ব্যয় লাগে। তাদের মতে, এই চাপ এড়াতে ইরান শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে আসবে।
তবে অন্যরা বলছেন, এই ধারণা ভুল। তাদের মতে, ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস তাদের ক্ষমতা আরও শক্ত করেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের আলোচকরা কোনো ছাড় দেওয়ার অনুমতি পাননি—না সর্বোচ্চ নেতার কাছ থেকে, না গার্ড বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে। ফলে সামরিক চাপ পুনরায় না বাড়ালে ইরানের অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা কম।
এমনকি বোমা হামলা পুনরায় শুরু হলেও ইরানের সিদ্ধান্তে বড় পরিবর্তন আসবে—এমন প্রমাণও খুব বেশি নেই। চাপ বাড়াতে হলে ট্রাম্পকে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার অনুমতি দিতে হতে পারে।
তবে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, ইরান এখনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় এবং এই অবস্থায় প্রণালি খুলে দেওয়ার একটি চুক্তিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।







