দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রথম ইউনিটে আজ থেকে জ্বালানি (ফুয়েল) লোডিং শুরু হচ্ছে। এর মাধ্যমে পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ শিল্পের জগতে বাংলাদেশ এক নতুন নাম। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় নির্মাণকাজ শুরুরআট বছরেরও বেশি সময় পর আজ থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের (ট্রায়াল রান) আগের ধাপে প্রবেশ করছে, দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাই হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই। প্রকল্পটির দুটি ইউনিট পুরোপুরি সম্পন্ন হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ যোগান দেবে।
ফুয়েল লোডিং মানেই ট্রায়াল রান নয়; তবে এটি একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে নির্মাণ পর্যায় থেকে পরিচালনা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর অর্থ হলো রিঅ্যাক্টরের ভেতরে ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানো। এর ফলে নিরাপত্তা যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা ট্রায়াল রানের আগে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আজ দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে কেন্দ্র এলাকায় এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে ১৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত প্রকল্প এলাকায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বক্তব্য রাখবেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফুয়েল লোডিং শুরু হওয়ার প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাস পর প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে গ্রিডে যুক্ত হবে। সেই হিসেবে আগামী জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এরপর প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিটের সক্ষমতার পুরো ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এদিকে, ১,২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটের ফুয়েল লোডিং চলতি বছরের শেষের দিকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রটির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর, যা পরবর্তীতে আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব। উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের নিরাপত্তা মান ও পরিচালনা পদ্ধতি পরিদর্শন করে একটি প্রাক-অপারেশনাল সেফটি রিভিউ মিশন পরিচালনা করেছিল।
পূরণ হচ্ছে ৬৫ বছরের স্বপ্ন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে ১৯৬২ সালে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়। কিন্তু, নানান কারণেই কয়েক দশক ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অগ্রগতি ধীর ছিল।
২০০৯ সালের পর এই ইস্যুটি গতি পায় এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন রাশিয়ার জেএসসি অ্যাটমস্ট্রোয় এক্সপোর্টের সঙ্গে ২,৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর নির্মাণের চুক্তি করে। ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের জন্য ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ভিভিইআর-১২০০ ভিত্তিক অন্যান্য কেন্দ্রের ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হাঙ্গেরি দুটি ইউনিটের জন্য ব্যয় করেছে ১৩.২ বিলিয়ন ডলার, বেলারুশ ১১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে তুরস্ক ও মিশর চারটি করে ইউনিটের জন্য যথাক্রমে ২০ ও ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।
এদিকে ভিয়েতনামের নিন থুয়ান পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বর্তমানে অন্তত ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলে দেশটির শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক (মার্চ ২০২৬) তথ্যে জানা গেছে।
তবে ভারতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রকল্প রয়েছে, যেখানে খরচ কম। ভারতে ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২টি ইউনিট নির্মাণে প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে। ভারতের এই ব্যয় মূলত যন্ত্রপাতি বা রিঅ্যাক্টর স্থাপনের খরচ, এর বাইরে অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় আলাদাভাবে বহন করা হয়েছে। ফলে সরাসরি তুলনা করলে, বাংলাদেশের প্রকল্পকে বেশি ব্যয়বহুল মনে হলেও—বাস্তবে তা সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩১টি দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে, যা বিশ্বের মোট বিদ্যুতের প্রায় দশভাগের একভাগ সরবরাহ করে। আইইএ-এর তথ্যমতে, ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি বা মোট বিদ্যুতের ৬৫ শতাংশ আসে পারমাণবিক উৎস থেকে। এরপরেই স্লোভাকিয়া, ইউক্রেন, হাঙ্গেরি ও ফিনল্যান্ডে এই হার ৪১ থেকে ৬৩ শতাংশ (২০২৩ পর্যন্ত হিসাবে)।
অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ও রাশিয়ায় মোট বিদ্যুতের ১৮ শতাংশ আসে পারমাণবিক উৎস থেকে। এ ছাড়া জাপানে এই হার ৯ শতাংশ, চীনে ৫ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ শতাংশ এবং ইরানে ২ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান তাদের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১৬ শতাংশ পারমাণবিক উৎস থেকে উৎপাদন করে, যেখানে ভারতে এই হার প্রায় ৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিদ্যুৎ সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে থাকলেও, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ার অংশ হিসেবে চীন দ্রুত তাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করছে।
সাধারণত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ব্যয় কয়লা ও গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় অনেক কম। ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় প্রায় ৪৮.২ ডলার, যেখানে কয়লার ক্ষেত্রে এই খরচ ৬৪ থেকে ৯৫ ডলার। রাশিয়ায় পারমাণবিক বিদ্যুতের খরচ সবচেয়ে কম—প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় মাত্র ২৭.৪ ডলার। অন্যদিকে, চীনে পারমাণবিক বিদ্যুতের খরচ ৫০ ডলার, যেখানে কয়লার জন্য খরচ হয় ৭১ ডলার এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ৮১ ডলার।
অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই কয়লা ও গ্যাসের তুলনায় পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বেশি সাশ্রয়ী।







