সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হলে রাজপথে নামার যে হুঁশিয়ারি জামায়াতে ইসলামী দিয়েছে, তা নিয়ে মোটেও বিচলিত নয় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। কারণ, সংস্কার পরিষদ গঠন এখন তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার শেষ দিন ছিল কাল। নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিন দুটি শপথ নেওয়ার কথা। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে; অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন দুটি শপথের প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথই নিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তাঁরা বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের বিষয়ে সংবিধানে কিছু নেই। ভবিষ্যতে এটি যুক্ত হলে তখন শপথের বিষয়টি আসবে। এর পর থেকে সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা চলছে। এর আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাবে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপির মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংসদে বিক্ষোভ দেখান জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা। তাঁরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। এই আদেশ ও জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে গণভোটে রায় এসেছিল। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করার কথা সংবিধান সংস্কার পরিষদের।
অন্যদিকে বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান সম্পর্কে বলা আছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একইভাবে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের পর (১৪ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। জুলাই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার শেষ সময় আজ রোববার। আদেশ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির এই অধিবেশন আহ্বান করার কথা; কিন্তু সেটি হয়নি।
গতকাল শনিবার বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৫ মার্চ সরকারের ৩০ দিন পূর্ণ হবে। এর মধ্যে যদি সরকার জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকে বা ডাকার ব্যবস্থা না করে, তাহলে তারা জাতির কাছে ক্ষমা পাবে না। সংসদ নেতাসহ সরকারকেই এর দায়দায়িত্ব নিতে হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। শিগগিরই শীর্ষ নেতারা বৈঠক করে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক বলেন, একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে, দুটি অধিবেশনই ডাকার কথা। কিন্তু অধিবেশন ডাকা হয়েছে শুধু জাতীয় সংসদের। বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তে সংসদ সদস্যের শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এতে বোঝা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের আগের অবস্থান থেকে ইউটার্ন নিয়েছে, সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে চলে গেছে। এর মাধ্যমে জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। যারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে, তাদের অপমান করা হয়েছে।
জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান–সম্পর্কিত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো, কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, নিম্নকক্ষের ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা; ন্যায়পাল, সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে।
যেমন বিএনপি চায় উচ্চকক্ষ গঠিত হবে সংসদে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে। অর্থাৎ সংসদ নির্বাচনে একটি দল যতটি আসন পেয়েছে, তার অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন পাবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। বিএনপি তাদের প্রস্তাবগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছিল। অন্যদিকে গণভোটে প্রস্তাবগুলো ছিল জুলাই সনদে যেভাবে আছে সেভাবে, বিএনপির ভিন্নমতের উল্লেখ ছাড়া।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, তাঁরা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের ফরম যুক্ত হলে, কে এই শপথ পড়াবেন, তা নির্ধারিত হলে, তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যাবে।
সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান হলো, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়নে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এই পরিষদ পূর্ণতা পায়নি।







