ভারতের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে জার্মানির সঙ্গে সম্পাদিত হতে যাওয়া ৮০০ কোটি ডলারের ‘প্রজেক্ট-৭৫ (আই)’ সাবমেরিন চুক্তির মাধ্যমে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্পটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে চলতি বছরের মার্চের শেষ নাগাদ দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে। এই চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ৭২ হাজার কোটি রুপি, যা ২০১৬ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে হওয়া রাফাল যুদ্ধবিমান চুক্তির ৫৮ হাজার কোটি রুপির রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে। মূলত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং রণকৌশল মোকাবিলায় ভারতীয় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতেই এই বিশাল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় মোট ছয়টি অত্যন্ত উন্নতমানের ‘টাইপ-২১৪ নেক্সট-জেনারেশন’ ডিজেল-ইলেকট্রিক অ্যাটাক সাবমেরিন তৈরি করা হবে। এই সাবমেরিনগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ফুয়েল-সেল-ভিত্তিক এয়ার-ইন্ডিপেনডেন্ট প্রোপালশন বা এআইপি প্রযুক্তি। বর্তমানের প্রচলিত সাবমেরিনগুলো যেখানে মাত্র কয়েক দিন পর পর পানির উপরে আসতে হয়, সেখানে এই প্রযুক্তির ফলে ভারতীয় সাবমেরিনগুলো টানা কয়েক সপ্তাহ পানির গভীরে নিমজ্জিত থাকতে পারবে। এটি যেমন শত্রুপক্ষের রাডারে ধরা পড়ার ঝুঁকি কমাবে, তেমনি ভারতের সামুদ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে করে তুলবে আরও দুর্ভেদ্য।
চুক্তিটি বাস্তবায়নে জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস বা টিকেএমএস-এর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড। ভারত সরকারের ‘মেক-ইন-ইন্ডিয়া’ নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রকল্পে ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ দেশীয়করণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মারজের ভারত সফরের সময় প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটে, যা এই চুক্তি স্বাক্ষরের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।
বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরে থাকা পুরনো সাবমেরিনগুলোর জায়গায় এই নতুন সংস্করণগুলো যুক্ত হলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য ভারতের অনুকূলে আসবে। এই প্রকল্প কেবল সামরিক শক্তিই বাড়াবে না, বরং সাবমেরিন সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ ও সিস্টেম তৈরির মাধ্যমে ভারতের উৎপাদন খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এমএসএমই) এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সরকারের ‘ইন্ডিয়ান নেভাল ইন্ডিজেনাইজেশন প্ল্যান’-এর অধীনে যেভাবে একের পর এক যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন নৌবাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে, এই জার্মান চুক্তিটি সেই অগ্রযাত্রায় এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
প্রদা/ডিও







