রমজান সামনে রেখে দেশের ছয় বড় আমদানিকারকসহ বড় একটি সিন্ডিকেটের ১০ লাখ টনেরও বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে প্রায় ৬০০ লাইটার জাহাজ দেশের নদী ও সাগরে মাসের পর মাস আটকে আছে ‘ভাসমান গুদাম’ হয়ে।
গভীর সমুদ্র থেকে নামানো গম, ভুট্টা, ছোলা, ডাল, সয়াবিন ও চিনি ঘাটে নামার বদলে জাহাজেই ভাসছে। এর ফলে একদিকে যেমন লাইটার জাহাজের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে আসন্ন রমজানে পণ্যের কৃত্রিম ঘাটতি ও দাম বাড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বর্তমানে রেকর্ড ১৭৬টি বড় মাদার ভেসেল নোঙর করে থাকলেও লাইটার সংকটের কারণে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য নামিয়ে দেশের বিভিন্ন ঘাটে পাঠানোর কথা থাকলেও আমদানিকারকরা লাইটারগুলোকে খালাস না করে সাগরে ভাসিয়ে রাখছেন।
এই সিন্ডিকেটের শীর্ষে রয়েছে আকিজ গ্রুপ, যারা একাই প্রায় ৮০টি লাইটার জাহাজ আটকে রেখেছে। এছাড়াও নাবিল গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ পণ্য নিয়ে অন্তত ৬০০টি লাইটার জাহাজ ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে।
স্বাভাবিক সময়ে একটি লাইটার জাহাজ ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে পরবর্তী ট্রিপের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে অনেক জাহাজ ৩০ থেকে ৪০ দিন ধরে সাগরে অলস বসে আছে। এই কৃত্রিম জটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে থাকা বড় জাহাজগুলোর অপেক্ষার সময় ২০ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়িয়েছে, যা আগে ছিল মাত্র ৭ থেকে ১০ দিন। বর্তমানে প্রায় ৭২০টি লাইটার জাহাজ লোড করা অবস্থায় বিভিন্ন নদী ও সাগরে ভাসছে, যার বড় একটি অংশ গম, ডাল, চিনি ও সরিষাবাহী। এই পরিস্থিতিতে নৌপরিবহন অধিদপ্তর কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমদানিকারকেরা আগে নিজস্ব গুদাম বা ভাড়া করা গুদামে পণ্য রাখতেন। কিন্তু গত অন্তত ১০ বছর ধরে লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম বানিয়ে পণ্য মজুতের প্রবণতা বাড়ছে। ভাড়ার গুদামে পণ্য রাখলে যে খরচ হয়, লাইটারে রাখলে তা তুলনামূলক কম পড়ে। গুদামে নামালে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হাতে মজুতের হিসাব থাকে। এতে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আছে কি না জানা যায় এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কঠিন হয়। কিন্তু লাইটারে রাখলে সেই হিসাব সহজে বের করা যায় না। এতে চাহিদার সময় পণ্য আটকে রেখে বাজারে সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো যায়।
এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) নৌপরিবহন অধিদপ্তর আমদানিকারক ও তাদের এজেন্টদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে পণ্যবোঝাই অবস্থায় থাকা লাইটার জাহাজ খালাসের কড়া নির্দেশ দিয়েছে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারী জানিয়েছেন যে পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে এবং ঢাকা ও খুলনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য মজুত করে বাজারে সংকট তৈরির চেষ্টা করলে নিয়মিত মামলার পাশাপাশি কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইতিমধ্যে মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কিছু লাইটার জাহাজকে জরিমানাও করা হয়েছে। প্রশাসনের এই তৎপরতায় গত একদিনেই ৮০টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রদা/ডিও






