লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সোমালিয়া সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও সামরিক ঘাঁতি থেকে আমিরাতকে সরিয়ে যেতে হবে। সরকার জানাচ্ছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সোমালিয়ার এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, সোমবার মোগাদিশু সরকার আমিরাতের সঙ্গে করা সব চুক্তি বাতিল করে। এতে ফেডারেল সরকার, আঞ্চলিক প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে করা সব সমঝোতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বেরবেরা, বসাসো ও কিসমায়ো বন্দরের সঙ্গে চলমান সব সহযোগিতা এ সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে।
সোমালিয়ার মন্ত্রিসভা আমিরাতের সঙ্গে করা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ’ পাওয়া যাওয়ার পরই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সোমালিয়ার সাধারণ নাগরিক ও বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই বলছেন, এটি দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল্লাহি ফারমাজোও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তবে আমিরাতের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সোমালিল্যান্ড সরকারের এক মন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে মোগাদিশুর সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বেরবেরা বন্দর তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং আমিরাত তাদের ‘বিশ্বস্ত মিত্র’। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবতায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
এরপরই আমিরাত সোমালিয়ার বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে তাদের সেনা ও সরঞ্জাম সরিয়ে নিচ্ছে। পুন্তল্যান্ড অঞ্চলের বসাসো ঘাঁটিও এর মধ্যে রয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা সদস্যরা প্রতিবেশী ইথিওপিয়ায় সরানো হচ্ছে। তবে পুন্তল্যান্ড প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের এ সিদ্ধান্তকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে, বিশেষ করে সোমালিল্যান্ড ইস্যুতে। গত ২৬ ডিসেম্বর ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষ করে বেরবেরা বন্দরকে কেন্দ্র করে এই স্বীকৃতি নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনা হয়েছে।
সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা বন্দর ইতোমধ্যে লোহিত সাগর ও আদেন উপসাগরে আমিরাত নিয়ন্ত্রিত সামরিক ঘাঁটির অংশ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেরবেরায় আমিরাতের নৌঘাঁটিটি আধুনিক সামরিক স্থাপনায় রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে গভীর পানির জেটি, রানওয়ে, বিমান হ্যাঙ্গার ও আধুনিক সামরিক সুবিধা রয়েছে। চার কিলোমিটার দীর্ঘ রানওয়ে ভারী সামরিক বিমান ও যুদ্ধবিমান ওঠানামায় সক্ষম।
বেরবেরা বন্দরটি যৌথভাবে পরিচালিত হচ্ছে আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড, সোমালিল্যান্ড সরকার এবং ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট সংস্থার মাধ্যমে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।






