শাসক পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের চরিত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি—এমন মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নিরাপত্তা ইস্যুতে জনগণের আস্থা নষ্ট হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়ার বদলে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা: গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংলাপে এসব মতামত তুলে ধরা হয়।
সংলাপে সাবেক আইজিপি ড. এম. এনামুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি পুলিশে এফআইআর সংক্রান্ত বিদ্যমান সমস্যাজনক চর্চা বন্ধের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম, রাজস্ব বোর্ড ও পরিবহন খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ে। তার মতে, নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা এখন অকার্যকর; বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এটি বহুমাত্রিক ও জটিল। তিনি ভেনেজুয়েলা, পানামা ও চিলির উদাহরণ টেনে বলেন, অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বহিরাগত ঝুঁকিও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত নিরাপত্তা হুমকির কথাও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্র মবচাপের কাছে নতজানু এবং পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে পুনর্গঠনের বদলে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মনোবল ভেঙে পড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সীমান্ত নিরাপত্তা সংকটে পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ বলেন, বর্তমান নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ নয়। এটি জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত না হলে জনআস্থা আরও কমবে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, সামরিক শাসন, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা নির্বাচিত সরকার—কোনো সময়েই রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের সময়েও হত্যা, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন বেড়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়েও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে জনগণের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোশতাক হোসেন বলেন, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আসলে কাদের জন্য—এই প্রশ্নটি আজও উপেক্ষিত। উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা জোরদার হলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না, যা মূল সংকটকে স্পষ্ট করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী আকবর বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা একটি বিস্তৃত ধারণা; নন-ট্র্যাডিশনাল নিরাপত্তা উপেক্ষিত হলে সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অর্থের বিনিময়ে এনআইডি পাওয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক ও বিশ্লেষকরা। তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে, জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক শাসন টেকসই করার প্রধান শর্ত।
সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
প্রদা/ডিও






