এ বছরের গ্রীষ্মকালে সম্ভাব্য লোডশেডিং এড়াতে এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর বড় অংকের আর্থিক বোঝা চাপিয়ে না দিতে, অন্তর্বর্তী সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিশোধিত ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভর্তুকির সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক চাপের কারণে দীর্ঘদিনের অর্থ পরিশোধ বিলম্বিত হওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা ইতোমধ্যেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যা সরবরাহ মার্জিন কম থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এই ঝুঁকি সবচেয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এস এস আই পাওয়ার লিমিটেডে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করেছে, বকেয়া পরিশোধ না হলে কয়েক দিনের মধ্যেই তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে।
গত ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) পাঠানো এক চিঠিতে এস এস পাওয়ার জানায়, তাদের অনাদায়ী বিল ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, তাই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এসব বকেয়া পরিশোধ না হলে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করার অধিকার রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এস এস পাওয়ার একক কোনো ঘটনা নয়। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন—বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছে বিপিডিবির মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিকভাবে বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হবে, বিশেষত যখন গ্যাস-সংকটের কারণে অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সক্ষমতার অনেক নিচে চলছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বেসলোড উৎপাদন হারালে সামনের মাসগুলোতে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, কারণ বিকল্প উৎসগুলো ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া সিস্টেমের ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ও কম।
তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় বিপিডিবি
বিপিডিবির কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকলেও এস এস পাওয়ার বন্ধ হলে তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হবে।
বিপিডিবির চট্টগ্রাম পূর্ব জোনের সুপারইনটেনডেন্ট প্রকৌশলী একেএম জাশিম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে চাহিদা কম থাকায় কোনো লোডশেডিং নেই।
তিনি বলেন, “গ্রীষ্মকালে চাহিদা থাকে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। শীতে তা নেমে আসে ৮ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াটে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, বকেয়া নিয়ে এই বিরোধ যদি পিক চাহিদার মৌসুম পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
গ্যাস সরবরাহ কমায় বাড়ছে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম এবং সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও কমেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ৪ জানুয়ারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা হয়েছে দৈনিক ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস (এমএমসিএফডি), যেখানে চাহিদা ছিল ২,৫২৫ এমএমসিএফডি। ৩ জানুয়ারি সরবরাহ নেমে আসে ৬৬২ এমএমসিএফডিতে, যা প্রয়োজনের মাত্র এক-চতুর্থাংশ।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৫২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, পাশাপাশি ভারত ও নেপাল থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ৫ জানুয়ারি বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৫৪২ মেগাওয়াট, আর আমদানিসহ মোট উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট।
বিপিডিবি নিয়মিত দৈনিক উৎপাদন ও লোডশেডিংয়ের তথ্য প্রকাশ করলেও ২৮ ডিসেম্বরের পর থেকে আর কোনো লোডশেডিংয়ের তথ্য আপলোড করা হয়নি। ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ ছিল।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, লোডশেডিংয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত নেই।
ফাওজুল কবির খান বলেন, “বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক একটা বিঘ্ন মানেই লোডশেডিং নয়। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্বল্প সময়ের বন্ধ রাখা—গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্যই দরকার, এটাকে লোডশেডিং বলা উচিত নয়।”
প্রদা/ডিও






