বিশ্ববাণিজ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সুষম বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা একত্র হয়ে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চীনের সতর্ক নজর: সম্পর্কের উষ্ণতা কমছে
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীনের সম্পর্ক প্রথম দিকে ঘনিষ্ঠ থাকলেও পরবর্তী সময়ে দৃশ্যপট পাল্টেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির পর চীন বাংলাদেশকে নিয়ে সতর্ক অবস্থানে গেছে।
এলডিসি উত্তরণের পর আগের শুল্কসুবিধা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো কোনো লিখিত নিশ্চয়তা দেয়নি দেশটি।
ভারতের সঙ্গে স্থবির বাণিজ্য: সীমান্তপথে বাধা–নিষেধ
দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকেই টানাপোড়েন বেড়েছে।
স্থলপথে একাধিক পণ্যের বাণিজ্য বন্ধ ও নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমেছে। এর ফল ভুগছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে চাল আমদানি বন্ধ হওয়ায় এখন সিঙ্গাপুর থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে।
জাপানের সঙ্গে দরকষাকষি: ইপিএ চুক্তি অনিশ্চয়তায়
আরেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী জাপান যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া সুবিধা সমপর্যায়ের সুবিধা দাবি করেছে। এর ফলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। জাপান বলছে, তাদের গাড়ির ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক কমাতে হবে।
ইইউ-এর চাপ: এয়ারবাস বনাম বোয়িং কেনাকে কেন্দ্র করে হুমকি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিরাপদ বাণিজ্য অংশীদার, সর্বশেষ চাপ সৃষ্টি করেছে বিমান ক্রয়কে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তির আওতায় আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বোয়িং থেকে বিমান কেনার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
কিন্তু আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্রান্সের এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার বিষয়টি কার্যকর না হলে ইউরোপ ক্ষুব্ধ হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
জার্মান রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সতর্ক করে বলেছেন “এয়ারবাস কেনা নিয়ে সিদ্ধান্ত বদল হলে বাংলাদেশের জিএসপি প্লাস সুবিধা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট এম কে মুজেরী বলেন “অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু দেশের বাণিজ্যকে হুমকিতে ফেলেনি, ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারও এর খেসারত দেবে।”
তিনি আরও বলেন “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য সমঝোতার উদাহরণ দিয়ে এখন অন্য দেশগুলোও বাড়তি সুবিধা দাবি করবে। ইউরোপের সঙ্গে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেটিও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি।”
চট্টগ্রাম বন্দর ও পানগাঁও টার্মিনাল নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেও যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সমগ্র পরিস্থিতি: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় সংকটের মুখে বাংলাদেশ
চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—বিশ্ববাণিজ্যের শক্তিধর অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শর্তের চাপ বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এলডিসি-পরবর্তী বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় এখন সঠিক নীতি, সুসমন্বিত কূটনীতি ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজন আরও বেশি।
প্রদা/ডিও







