২২ বছরের অপেক্ষা। গল্পগুলো ছিল প্রায় একই। ম্যাচের শুরুতে এগিয়ে থেকেও শেষদিকে গোল হজম করে জয় হাতছাড়া। তাতে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের বিপক্ষে ফুটবলে জয় মিলেনি বাংলাদেশের। অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত জয়। শেখ মোরসালিনের দেওয়া একমাত্র গোলে জয় মিলেছে বাংলাদেশের। ২২ বছরের হাহাকারের পর গতকাল এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তৃতীয় রাউন্ডের ফিরতি লেগে ১–০ ব্যবধানে বাংলাদেশ হারিয়েছে ভারতকে। রাতে ঢাকার আকাশ ভরে উঠে উল্লাসে।
১২ মিনিটে মোরসালিনের করা গোলটি বাকি সময় ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। সেই কৃতিত্ব সিংহভাগই হামজা চৌধুরীর অবদান। এক কথায় ম্যাচটি ছিল হামজাময়।
ম্যাচে সাদ উদ্দিন হেড করে বলটা ক্লিয়ার করার পর বাংলাদেশ বক্সের বাইরে বল যায় মোরসালিনের পায়ে। প্রথমার্ধ জুড়ে দারুণ কিছু ‘ফার্স্ট টাচ পাসে’ মুগ্ধতা ছড়ানো মোরসালিন প্রথম স্পর্শের দারুণ পাসে বল দেন বাঁ পাশে রাকিব হোসেনের কাছে। রাকিবের গায়ের সঙ্গে লেগে ছিলেন এক ডিফেন্ডার, তার পাস আটকাতে মাঠের মাঝদিকে দৌড়েছিলেন ভারতের আরও দুই ডিফেন্ডার। কিন্তু তারা তিনজন খেয়াল করেননি–পাসটা দেওয়ার পরই ভোঁ–দৌড়ে মাঠের মাঝ ধরে তাদের তিনজনকে এড়িয়ে উঠেছেন মোরসালিন। রাকিব বল পায়ে দৌড়ালেন বাঁ প্রান্ত ধরে। এক সেকেন্ডের জন্য একটু থেমে পায়ের স্পর্শে বোকা বানান গায়ের সঙ্গে লেগে থাকা ডিফেন্ডারকে। আরেকটু এগোলেন। ভারতের ডিফেন্ডার তাকে ধরে ফেলছিলেন, এমন সময়ে ডান পায়ের বাইরের অংশের দারুণ স্পর্শে বক্সের মাঝের দিকে থ্রু বাড়ান রাকিব। ভারতের তিন ডিফেন্ডারকে এড়িয়েই বল চলে যায় দৌড়ে উঠতে থাকা মোরসালিনের দিকে। ভারত গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধু পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন কিন্তু টাইমিং ঠিক হল না তার। মোরসালিন আগেই বলের দিকে ছুটলেন। তিনি যখন বল পায়ে পাচ্ছেন, তার বাঁ দিকে ভারতের ডিফেন্ডার, সামনে গোলকিপার। দৌড়ের গতিপথও তাকে বাঁ দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল। ফলে মোরসালিনের পক্ষে হঠাৎ দিক বদলে ডানে যেতে গেলে অ্যাঙ্কেল ভাঙার ঝুঁকি ছিল, আবার বলে একটা স্পর্শ নিয়ে যে বাঁ দিকে যাবেন, সেটার সুযোগ খুব বেশি রাখেননি ভারতের ডিফেন্ডাররা। মোরসালিন মুগ্ধতা ছড়ালেন। প্রথম স্পর্শেই সরল কিন্তু চোখ ধাঁধানো ফিনিশিংয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন ভারতের গোলকিপারের পায়ের ফাঁক গলে। গোলের পর আরও দুটি আক্রমণে রাকিবের ক্রসটা ঠিকঠাক হলে বাংলাদেশ ভয় ধরাতে পারত ভারতের রক্ষণে। এরপর অবশ্য বাংলাদেশই ধাক্কা খেল আগেই কাঁধে চোট পাওয়া ডিফেন্ডার তারিক কাজী ২৭ মিনিটে উঠে যেতে বাধ্য হওয়ায়। বল পায়ে স্বচ্ছন্দ্য তারিক উঠে যাওয়ায় ভারত সুযোগ পেল। হাই প্রেসিংয়ের মুখে বাংলাদেশ গোলকিপার মিতুলের ভুলে বাংলাদেশ একবার গোলও খেয়ে যেতে বসেছিল। বক্সের ডানপাশে গিয়ে মিতুল বল হারালেন, এক পাস ঘুরে বল বক্সের ওপরের দিকে বাঁ পাশে গেল লালিয়ানজুয়ালা রাংটের কাছে। তিনি যখন শট নিলেন, বাংলাদেশের পোস্টে গোলকিপার নেই। কিন্তু বাংলাদেশের হামজা–প্রথমার্ধ জুড়ে যিনি রক্ষণের সামনে চীনের মহাপ্রাচীর হয়ে ছিলেন, সেই এক মুহূর্তে বনে গেলেন উদ্ধারকারী জাহাজ! শেষ দিকে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের অ্যাক্রোব্যাটিক ভলিতে ভারতের বুকও কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন হামজা। বলটা পোস্টে বাতাস লাগিয়ে চলে যাওয়ায় হামজার টানা দুই ম্যাচে চোখধাঁধানো গোল পাওয়া হল না।
দ্বিতীয়ার্ধে ভারত নেমেছে মাঝমাঠে একটা পরিবর্তন করে। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার নিখিল প্রভুর বদলে নামিয়েছে নাওরেম মাহেশ সিংকে। নাওরেম দারুণ সব পাস দিয়েছেন, তিনি নামার পর জায়গার দখল দারুণভাবে নিয়ে নেয় ভারত। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই চলে যায় ভারতের কাছে। শুরুতেই দুবার গোল দেওয়ার খুব কাছে চলে যায় ভারত। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অনেকটা সময় তো বাংলাদেশ নিজেদের অর্ধেই বন্দী হয়ে ছিল। তবে ভারত একেবারে পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। বাংলাদেশও এই অর্ধের মাঝামাঝির পর থেকে দু–তিনবার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পাসটা ঠিকঠাক না হওয়ায় আক্রমণে খেই হারিয়েছে। এর মধ্যে ৮২ মিনিটে বাংলাদেশের একটা পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দেন রেফারি, ভিএআর থাকলে যে আবেদনে নিশ্চিত পেনাল্টি পেত বাংলাদেশ। বক্সে ভারতের অধিনায়ক সান্দেশ ঝিঙ্গানের হাতে বল লাগলেও রেফারির চোখ এড়িয়ে যায় সেটি। সামপ্রতিক সময়ে একের পর এক ম্যাচে বাংলাদেশ শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে হতাশায় পুড়তে হয়েছে বলে ম্যাচ যত শেষের দিকে এগিয়েছে, বাংলাদেশের সমর্থকদের স্নায়ুচাপ তত বেড়েছে। তবে গতকাল আর তেমন কিছু হয়নি।
গতকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস গড়ার দিন! ২০০৩ সাফের পর ভারতকে আরেকবার হারানোর দিন। এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ পাঁচ ম্যাচ শেষে ৫ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় স্থানে। ভারতের বিপক্ষে ভারতে ড্র ও হংকংয়ে একটি ড্র করেছিল বাংলাদেশ। দুটি হোম ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছিল। গতকালই প্রথম হোম ম্যাচে জিতল এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে। ভারত দুই পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের নিচে। দুই দলেরই এশিয়া কাপ খেলার সম্ভাবনা আগের ম্যাচেই শেষ হয়েছে।
প্রদা/ডিও







