পণ্য ও সেবা রপ্তানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনা বাবদ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে। টিবিএসের হাতে আসা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নথি অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের প্রণোদনার অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
সরকার জুন পর্যন্ত রপ্তানি প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করলেও পরের তিন মাসের পাওনা বকেয়া রয়ে গেছে। এর ফলে যেসব রপ্তানিকারকদের ব্যবসা সচল রাখতে ও নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনার জন্য এই সহায়তার ওপর নির্ভর করেন, তাদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
রেমিট্যান্সের ২.৫ শতাংশ প্রণোদন ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে প্রেরকদের দিলেও রপ্তানির ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকার থেকে প্রণোদনার অর্থ ছাড় পাওয়ার পর রপ্তানিকারকদের দেওয়া হয়।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, অর্থ ছাড়ে এই বিলম্বের কারণে প্রণোদনা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ছেন। ওইসব দেশে রপ্তানি প্রণোদনা যেমন বেশি দেওয়া হয়, তেমনি তাদের অর্থও দ্রুত পরিশোধ করা হয়।
অর্থ পেতে ১৮ মাস পর্যন্ত লাগে
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, পণ্য জাহাজীকরণের পর প্রণোদনার অর্থ হাতে পেতে রপ্তানিকারকদের সাধারণত প্রায় ১৮ মাস সময় লেগে যায়।
রপ্তানি আয় দেশে আসার পর রপ্তানিকারকরা প্রণোদনার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকে আবেদন করেন। এরপর ব্যাংক সেটি অডিট ফার্মে পাঠায়, অডিট ফার্ম যাচাই-বাছাই করে সনদ দেয়। সেখান থেকে সনদ বাণিজ্যিক ব্যাংকে আসার পর তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়।
হাতেম জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নথিপত্র পাঠানোর এই প্রক্রিয়াতেই প্রায় এক বছর লেগে যেতে পারে। অন্যদিকে পণ্য জাহাজীকরণের পর রপ্তানি আয় দেশে আসতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস।
‘অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে অর্থ পেতে দেড় বছর সময় লেগে যায়,’ বলেন তিনি।
হাতেম জানান, আগে এই অপেক্ষার সময় দুই বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতো। এখন সময় কিছুটা কমলেও এই বিলম্বের কারণে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এখনো ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, একসময় বকেয়ার পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছিল। তবে সরকার প্রণোদনার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার কারণে বকেয়ার পরিমাণ আগের চেয়ে কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিটি ব্যাংকের বকেয়া রয়েছে ১১২ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৩২.৪৫ কোটি টাকা, ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশের ৯৮ কোটি টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ৩৩.৮৬ কোটি টাকা ও ইস্টার্ন ব্যাংকের বকেয়া ১০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারিকৃত সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী (২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বহাল থাকা), দেশের মোট ৪৩টি রপ্তানি খাতে ০.৩০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা বা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নগদ সহায়তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত। তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য ৫ % প্রণোদনা দেওয়া হয়।
৪৩ রপ্তানি খাতে মিলছে সহায়তা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী—যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বহাল রয়েছে—দেশের মোট ৪৩টি খাতের রপ্তানিকারকরা ০.৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য।
নগদ সহায়তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত। পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালে দুই দফায় রপ্তানি প্রণোদনা কমায়। তখন বলা হয়, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান অনুসারে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর কোনো ধরনের রপ্তানি প্রণোদনা বা নগদ সহায়তা দেওয়া যায় না। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর একবারে সহায়তা প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তাই ধাপে ধাপে সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।






