বেসরকারি পর্যায়ে সাড়ে ৯ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আমদানির প্রক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে জটিলতা। দরপত্র খোলার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আমদানিকারকদের চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কার্যাদেশ আটকে থাকায় রবিশস্যের ভরা মৌসুমে বেসরকারিভাবে আমদানি করা সারের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, কার্যাদেশ পাওয়ার পর আমদানি করা সার কৃষকের কাছে পৌঁছাতে সাধারণত ৮০ থেকে ৯০ দিন সময় প্রয়োজন হয়। অপেক্ষাকৃত কাছের উৎস থেকে দ্রুত আমদানি করা গেলেও মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে অন্তত দেড় মাস সময় লাগে। ফলে দ্রুত কার্যাদেশ না দেওয়া হলে আসন্ন শীতকালীন মৌসুমে সারের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
এর আগে নন-ইউরিয়া সার আমদানির দরপত্র সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে আহ্বান করা হতো। এরপর এক মাসের মধ্যেই কার্যাদেশ চূড়ান্ত করা হতো। এতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে বেসরকারি আমদানির সার দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেত। তবে এবার সেপ্টেম্বর মাসেও প্রক্রিয়াটি শেষ না হওয়ায় শীত মৌসুমের আগে প্রয়োজনীয় সার দেশে পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির আওতায় বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে ২ লাখ টন ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ৫ লাখ টন ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এবং আড়াই লাখ টন মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে গত ৩ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। পরে ১৮ আগস্ট দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়।
দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব পর্যালোচনার পর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দিষ্ট মূল্য প্রস্তাব করা হয় এবং আমদানিকারকদের সম্মতি চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন ও কার্যাদেশ পাননি। ফলে আমদানিকারকরা ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়াতেও যেতে পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট এক আমদানিকারক জানান, অতীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মে-জুনের মধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হতো। কোনো কারণে দেরি হলে সর্বোচ্চ জুলাই পর্যন্ত গড়াত। এবার সেপ্টেম্বরেও কার্যাদেশ না পাওয়ায় আমদানিকারকদের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাপনাও চাপে পড়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, উৎসভেদে সার দেশে আনতে এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত সময় লাগে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আনতে প্রায় এক মাস এবং মরক্কো থেকে আনতে দেড় মাসের মতো সময় প্রয়োজন হতে পারে। এরপরও বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের কাছে সার পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে। তাই কার্যাদেশ যত দেরিতে দেওয়া হবে, সরবরাহের সময়সূচিও তত পিছিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে আমদানিকারকরা দ্রুত অনুমোদনের দাবি জানিয়েছেন। অনুমতি পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সার দেশে আনার সক্ষমতা রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন। তার মতে, বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় সার সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ থাকায় জরুরি ভিত্তিতে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কার্যাদেশে বিলম্ব হলে পরবর্তী পিক সিজনে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এদিকে কার্যাদেশ দিতে দেরির কারণ হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগে নন-ইউরিয়া সার আমদানির ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকেই অনুমোদন দেওয়া হতো। তবে এবার প্রথমবারের মতো বিষয়টি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে কমিটি ৩০ হাজার টন এমওপি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিএপি সারের মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার টন। এমওপি ১ লাখ ৭১ হাজার টন এবং টিএসপি ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন মজুদ রয়েছে। তবে সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকালীন পিক সিজনে সারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বিএডিসির হিসাবে, এ সময়ে ডিএপির চাহিদা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ২৭ হাজার টন। এমওপির প্রয়োজন হবে ৬ লাখ ৭২ হাজার টন এবং টিএসপির চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ১৯ হাজার টন। ফলে বর্তমান মজুদের পাশাপাশি সময়মতো আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে সরবরাহে ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে আমন মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার নিয়ে অস্থিরতার অভিযোগ উঠেছে। কুড়িগ্রামে সার না পেয়ে কৃষকদের ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন জেলায় সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি মন্ত্রণালয় সার সরবরাহ মনিটরিংয়ের জন্য কন্ট্রোল রুম চালু করেছে। কয়েকটি জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে বদলিও করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও সার নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, শীতকাল দেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। এ সময়ে বিভিন্ন রবিশস্যের আবাদ বাড়ায় সারের চাহিদাও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। তাই মৌসুম শুরুর আগেই পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।






