বাংলাদেশ এমন একটি কূটনৈতিক সুযোগ থেকে দূরে থাকছে, যা কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারত। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। তবে এতে অংশ নিচ্ছে না বাংলাদেশ।
জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বিশ্বব্যবস্থায় যখন দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে, উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণও নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে, তখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ও শক্তিগুলোর একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত কতটা কৌশলগত—তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কেন এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে না এবং এ সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের কৌশলগত বিবেচনাগুলো কী?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ কারণেই সরকার সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আমন্ত্রণের ধরন নিয়ে প্রটোকলগত ব্যাখ্যা থাকতেই পারে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের পাশাপাশি তার সম্ভাব্য ফলাফল ও জাতীয় স্বার্থের দিকটিও বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে বড় কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন একই সময়ে একাধিক দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।
ব্রিকসের গুরুত্ব কেন বাড়ছে
ব্রিকস এখন আর শুধু ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে গঠিত পুরোনো কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর এর পরিসর সম্প্রসারিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়াও এতে যুক্ত হয়েছে।
ফলে বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, জ্বালানি সম্পদ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের একটি বড় অংশ এখন ব্রিকসের আওতায় রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও এই প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাসহ নানা বিষয় ব্রিকসের আলোচনায় রয়েছে।
অবশ্য ব্রিকস কোনো একক রাজনৈতিক বা সামরিক জোট নয়। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মতপার্থক্যও রয়েছে। তবে এসব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছে।
একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশ নেওয়ার অর্থ সেখানে থাকা সব দেশের অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। বরং নিজের জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরা, অন্য দেশগুলোর অবস্থান বোঝা এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করাই কূটনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য।
ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক
ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুরোপুরি নতুন নয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্রিকসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্য হয়।
২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের অন্যতম লক্ষ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটি ১৪১টি প্রকল্পে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের অনুমোদন দিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের উন্নয়ন অর্থায়নের গুরুত্ব যথেষ্ট। পরিবহন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিল্প অবকাঠামো, জলবায়ু অভিযোজন, পানি ব্যবস্থাপনা, নগর উন্নয়ন, ডিজিটাল অবকাঠামো ও লজিস্টিকস খাতে আগামী দিনে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করলে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
আমন্ত্রণের ধরন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তিটি দেওয়া হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে আমন্ত্রণের ধরন। প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কূটনৈতিক প্রটোকলের বিচারে এ পার্থক্যের গুরুত্ব থাকতে পারে। তবে অন্য দিক থেকে দেখলে, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়াটিও বাংলাদেশের জন্য একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত।
বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্বার্থ তুলে ধরতে পারত। ভারত, চীন, রাশিয়া এবং ব্রিকসের অন্যান্য সদস্যদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব ছিল।
একই সঙ্গে বিমসটেকের গুরুত্ব ও কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
সম্মেলনের বাইরেও থাকে কূটনৈতিক সুযোগ
বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু মূল অধিবেশনের বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সম্মেলনের ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা এবং বিভিন্ন দেশের নেতা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ ধরনের সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে পারত। ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের সুযোগও তৈরি হতে পারত।
একইভাবে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, উপসাগরীয় দেশ ও আফ্রিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া মানেই কোনো একটি দেশের পক্ষ নেওয়া নয়। চীন, রাশিয়া বা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের কোনো ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়া এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যায়।
সিদ্ধান্তটি নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে
একটি সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে না—বিষয়টি এককভাবে দেখলে হয়তো বড় কোনো সমস্যা মনে নাও হতে পারে। তবে এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলের সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্ব এখন ক্রমেই বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এশিয়া ও বৈশ্বিক দক্ষিণের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ছে। পাশাপাশি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম ও অর্থনৈতিক জোটেরও বিস্তার ঘটছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য যত বেশি সম্ভব কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বিষয়ে নতুন অংশীদার খোঁজার প্রয়োজন রয়েছে।
তাই ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নটি শুধু একটি সফর বাতিলের বিষয় নয়। বরং এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল কতটা বহুমুখী হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
বাংলাদেশ সেখানে অংশ নিলে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় চুক্তি বা দৃশ্যমান সাফল্য আসত না। তবে কূটনীতিতে সব সাফল্য তাৎক্ষণিক ফল দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অনেক সময় একটি বৈঠক, একটি যোগাযোগ বা একটি অনানুষ্ঠানিক আলোচনাই ভবিষ্যতে বড় সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করে।
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সেই ধরনের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারত। বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও নতুন অংশীদারত্বের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করলে এ সম্মেলনে বাংলাদেশের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করছে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিকে কতটা জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক, বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে পারে তার ওপর। ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।







