সর্বশেষ ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বিসিক। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৬ টন।
সর্বশেষ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার টন কম লবণ উৎপাদন হয়েছে। এরই মধ্যে ভোজ্য লবণের পাশাপাশি শিল্প খাতেও চাহিদা বাড়ায় আগের মজুদ দ্রুত কমে আসছে। উৎপাদনে বড় ঘাটতি, কমে আসা মজুদ আর বাড়তি চাহিদায় দেশে লবণের বাজারে তৈরি হয়েছে সরবরাহ সংকটের শঙ্কা। এ সুযোগে এক বছরের ব্যবধানে পাইকারিতে লবণের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেড় লাখ টন লবণ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) লবণ সেল।
বিসিকের সর্বশেষ উৎপাদন, সরবরাহ, মজুদ ও বাজারদর-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি মণ (৪০ কেজি) অপরিশোধিত লবণ বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ টাকায়। গত বছরের একই সময়ে এ দর ছিল ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রতি মণে দাম বেড়েছে ১২৭ টাকা বা ৫০ শতাংশ। এরই মধ্যে বাজারে দাম আরো ২০ টাকা বেড়ে প্রতি মণ ৪০০ টাকায় উঠেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজারের ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে লবণের চাহিদা ও ঘাটতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এ কারণেই বাজারে দাম বাড়ছে। নতুন মৌসুম শুরুর আগে আমদানি প্রক্রিয়া শেষ না হলে বাজারে আরো চাপ তৈরি হতে পারে।’
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বিসিক। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৬ টন। এতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৭৪ টন। অথচ এর আগের কয়েক মৌসুমে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। ২০২৩-২৪ মৌসুমে দেশে রেকর্ড ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টন লবণ উৎপাদন হলেও পরের মৌসুমে তা কমে ২২ লাখ ৫৫ হাজার টনে নামে। সর্বশেষ মৌসুমে উৎপাদন আরো কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৪৪ হাজার টনে।
উৎপাদন কমার পেছনে প্রধান কারণ ছিল বৈরী আবহাওয়া। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর মৌসুমের উৎপাদন শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ২৫ মে শেষ হয়। ১৯৪ দিনের এ সময়ে কুয়াশা, বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ৩৫-৪০ দিন মাঠে নামতে পারেননি চাষীরা। ফলে উৎপাদনের নির্ধারিত সময় পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় লবণ চাষের জমি বৃদ্ধির হারও কমে এসেছে।
এদিকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে লবণের মজুদ ছিল ৫ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৪ টন। এর মধ্যে পরিবহনরত ছিল ৩৫ হাজার ১৫০ টন। অর্থাৎ ব্যবহারযোগ্য মজুদের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার টন। নতুন মৌসুমে উৎপাদন শুরুর আগ পর্যন্ত এ মজুদ দিয়ে চাহিদা মেটানো কঠিন বলে মনে করছেন বিসিক ও মিল মালিকরা।
এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবেলায় দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমোদন চেয়েছে বিসিকের লবণ সেল। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিসিকের মহাব্যবস্থাপক ও লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের চাহিদা মূলত স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই মেটানো হয়। এবার ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়ায় আমদানি ছাড়া উপায় নেই। ঘাটতি বেশি হলেও নতুন মৌসুম আসার আগে সীমিত আকারে লবণ আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে।’
দেশে বছরে ২২-২৫ লাখ টন লবণের চাহিদা রয়েছে। অপরিশোধিত লবণ প্রক্রিয়াজাত ও আয়োডিনযুক্ত করার সময় ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হয়। আয়োডিনযুক্ত ভোজ্য লবণের চাহিদাই ৮ লাখ টনের বেশি। বাকি লবণ ব্যবহার হয় শিল্প খাতে, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্পে।
দেশের লবণ উৎপাদন মূলত কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় কেন্দ্রীভূত। সর্বশেষ মৌসুমে ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে প্রায় ৪০ হাজার ১৫০ চাষী লবণ উৎপাদন করেছেন।
ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের আশঙ্কা, নতুন মৌসুম শুরুর আগে মজুদ দ্রুত কমে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরো চাপ তৈরি হবে। এরই মধ্যে খোলা ও নন-ব্র্যান্ডেড লবণের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দ্রুত নতুন উৎপাদন শুরু ও প্রয়োজনীয় আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের বাজারে অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে।






