বাংলাদেশে ব্যাংকঋণের সুদের হার ধীরে ধীরে কমছে। ফলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়ার ব্যয় আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। সাধারণত ঋণের খরচ কমে এলে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ার কথা। কিন্তু দেশের বর্তমান বাস্তবতায় তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। বরং ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমলেও নতুন ঋণের চাহিদা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদ কমার এই প্রবণতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেয়ে অর্থনীতিতে বিরাজমান স্থবিরতারই বেশি প্রতিফলন করছে।
ব্যাংকিং খাতে আমানত বাড়লেও সেই অর্থ ঋণ হিসেবে বাজারে প্রবাহিত হচ্ছে না। ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোকে উদ্বৃত্ত অর্থ অন্যত্র বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আমানত ও ঋণের সুদের হারেও। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়ে মুদ্রানীতি কিছুটা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়ায় বাজারে সুদের হার আরও কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিকভাবে শক্তিশালী বেশ কয়েকটি ব্যাংক আমানত ও ঋণের সুদহার প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকে আমানতের গড় সুদ ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে এবং ঋণের সুদ ১০ থেকে ১১ শতাংশের আশপাশে রয়েছে।
তবে সুদের হার কমলেও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহে তেমন গতি নেই। গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে। এটি প্রায় ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ব্যবসা ও শিল্প খাতে নতুন ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ খাটাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে এসব সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ায় সেগুলোর রিটার্নও কমে এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে।
এদিকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ এক বছরে ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকে অর্থের সংকট না থাকলেও সেই অর্থ অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার হচ্ছে না।
ডলারের বাজারেও বাড়ছে সরবরাহ
ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশে ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও আমদানি চাহিদা কম থাকায় টাকার ওপর শক্তিশালী হওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশীয় মুদ্রার অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ৫ কোটি ডলার কিনেছে। ওই সময় বাজারে রেমিট্যান্সের ডলারের দর ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সা।
ডলার কেনার পাশাপাশি দেশে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ তুলনামূলক ভালো থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বা গ্রস রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি ফেরেনি
সুদের হার কমার ঘটনাটি এমন একটি সময়ে ঘটছে, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের দুর্বল পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি এখনও বেশি। ফলে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমলেও মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে তার স্বস্তিদায়ক প্রভাব এখনও স্পষ্ট নয়।
অর্থনীতির এই পরিস্থিতিকে কেউ কেউ ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর ঝুঁকির সঙ্গেও তুলনা করছেন। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত গতিতে না বাড়ায় অর্থনীতিতে নতুন চাহিদা তৈরির বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন কমানো হচ্ছে নীতি সুদহার
বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুলাইয়ে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা তুলনামূলক কঠোর মুদ্রানীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নীতি সুদহার বাড়ানোর ধারায় ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সে সময় ৫ শতাংশের নীতি সুদহার ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় দুই বছর সেটি উচ্চ পর্যায়েই রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, উচ্চ সুদহারের মাধ্যমে বাজারের তারল্য কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। দীর্ঘ সময় সুদহার বেশি থাকার পরও মূল্যস্ফীতিকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামানো সম্ভব হয়নি।
তার মতে, উল্টো উচ্চ সুদ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ব্যয় বাড়িয়েছে। উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ার কারণে এর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেও যুক্ত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সরবরাহভিত্তিক কৌশলের দিকে নজর দিচ্ছে। অর্থাৎ ঋণের ব্যয় কমানোর মাধ্যমে উৎপাদন ও আমদানির খরচ কমানো এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
শুধু তারল্য বাড়ালেই অর্থনীতি ঘুরবে না
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলামের মতে, বর্তমানে কম সুদের হারকে অর্থনীতির স্বাভাবিক শক্তিশালী হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তার ভাষ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে ব্যাংকে আমানত এলেও ঋণ নেওয়ার মতো নতুন প্রকল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যথেষ্ট তৈরি হচ্ছে না।
এ কারণে ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। একই ধরনের নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে অধিকাংশ ব্যাংক ঝুঁকে পড়ায় এসব সরকারি সিকিউরিটিজের রিটার্নও কমছে।
সস্তা ঋণেও কেন ফিরছে না ব্যবসায়িক চাহিদা
ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক প্রবণতা দেখাচ্ছে, ঋণের সুদ কমার পরও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ঋণ নিতে খুব বেশি আগ্রহী হচ্ছে না।
দ্য সিটি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ। বিপরীতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল দুই অঙ্কের ঘরে। ফলে আমানত বাড়লেও সেই অনুপাতে ঋণ বিতরণ বাড়েনি।
ব্যাংকটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমার পর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে দ্রুত গতি ফেরার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ ও ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে রয়েছে।
ফলে ব্যাংকটি উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা তহবিলে রেখেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও মনে করেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির সরকারি হিসাব বাস্তব পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরছে না। কারণ অতীতের কিছু বাধ্যতামূলক ঋণ এবং সেই ঋণের ওপর জমা হওয়া সুদ হিসাবের মধ্যে থাকায় প্রকৃত নতুন ঋণ প্রবাহ আরও দুর্বল হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলেও ঋণের প্রবৃদ্ধি খুব বেশি বাড়বে না বলে তার ধারণা। তার মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে যে মাত্রার বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন, বর্তমান ঋণ প্রবাহ তা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, শুধু সুদের হার কমলেই ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্বল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিতে আগ্রহী হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ব্যবসার পরিবেশ ঠিক না হলে সুদ কমিয়ে লাভ নেই
বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকে করপোরেট ঋণের সুদহার ১১ থেকে ১২ শতাংশে নামানো হয়েছে। বড় ও প্রতিষ্ঠিত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে তা ৯ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। এসএমই ঋণে সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ এবং রিটেইল ঋণে ১১ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। শক্তিশালী ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদহারও প্রায় ৮ থেকে ৯ শতাংশে স্থিতিশীল হয়েছে।
অন্যদিকে আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণের পরিবর্তে নিজেদের তারল্য ধরে রাখতে আমানত সংগ্রহে তুলনামূলক বেশি সুদ দিচ্ছে। এসব ব্যাংকের আমানতের সুদহার কোথাও কোথাও ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত উঠছে।







