বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৭৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে নেপালের পুলিশ। তীর্থযাত্রী ও ট্রেকারদের কাছে জনপ্রিয় এলাকাটিতে বন্যার পর এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
দেশটির কর্তৃপক্ষ আজ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, নেপাল ও চীনের তিব্বতে অন্তত ৮০০ বিদেশিসহ প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ১৭৭ ছাড়িয়ে আরও বাড়তে পারে।
পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে রয়টার্সকে বলেন, “তল্লাশি আবার শুরু হয়েছে। আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে, তাই মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।”
পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানান, নেপালে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি।
দুই ডজনের বেশি দেশের নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫৫৮ জন। তাদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
প্রথমে কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল, ভূমিকম্পের কারণে বন্যা হয়েছে। তবে এখন ধারণা করা হচ্ছে, ভূমিধসের কারণে ভূকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় পুরো দেশ ‘স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত’।
আকস্মিক বন্যা ভিডিওতে দেখা যায়, ঘন বাদামি রংয়ের কাদামাটির প্রবল স্রোত বিস্তীর্ণ এলাকায় ঢুকে পড়েছে। পানির তোড়ে সেতু ও ঘরবাড়ি ভেঙে মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এলাকা।
গিরং সীমান্ত ক্রসিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রবল পানির স্রোত একটি ভবনে আঘাত হানার আগে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন।
দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসার সঙ্গে আগামী কয়েক দিনে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার আঘাতে নেপালের বিস্তৃত এলাকার বাড়িঘর, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্র তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি তিব্বতের গাইরং কাউন্টির একটি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রে ভূমিধস হয়েছে। এতে বহু স্থানীয় মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
এর আগে, প্রাথমিক তথ্য হিসেবে নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে অন্তত ৩৮৪ জন ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, ৩ জন মার্কিন ও ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, তাদেরও অন্তত আটজন নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে সীমান্ত এলাকার ভোটেকোশি নদীতে হঠাৎ তীব্র বন্যা দেখা দেয়। পানির প্রবল স্রোতে মুহূর্তের মধ্যেই বেশ কয়েকটি গ্রাম, গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক এবং একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়।
উদ্ধার অভিযানের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এই কঠিন দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে আমরা ভারত এবং চীন—উভয় দেশের কাছেই প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছি।’
এদিকে নেপালের নদীগুলো প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, তাই সীমান্তবর্তী ভারতের দুই রাজ্য উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় বন্যার আশঙ্কা
চীনের অংশে নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাথর, কাদামাটি ও পানির এক বিশাল দেয়াল সব ধ্বংস করে দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পথচারী ও অধিবাসীরা জীবন বাঁচাতে এদিকওদিক ছুটছেন।
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে প্রদর্শিত সময়ের মাত্র ৭ মিনিট আগে সেখানে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইসিআইএমওডি’র প্রতিনিধি চিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, লেন্দে খোলা নদীতে বরফ ও পাথরের ধসই এই বন্যার কারণ। সীমান্ত নদীতে বিশাল বাঁধ বা প্রতিবন্ধকতা এখনো আটকে থাকায় উজানে দ্বিতীয় আরেকটি বন্যা দেখা দিতে পারে।
এদিকে নদীর পানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হওয়ায় পাহাড়ি জেলা রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারছে না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গ্রামগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকে জানান, নদীর পাশের বসতিগুলো সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং তার নিজের পাঁচজন আত্মীয়ও নিখোঁজ। রাসুয়ার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার নিম্নাঞ্চলের লোকজনকে জরুরি ভিত্তিতে উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
গাইরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানাল চীন
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তসংলগ্ন শিগতসে অঞ্চলের গাইরং বন্দরে ভূমিধসের ফলে সেখানকার যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও সড়ক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
চীন সরকার ইতোমধ্যে ৫৭৪ জন উদ্ধারকারী পাঠিয়েছে। তবে পথের ওপর প্রায় ৫ ফুট গভীর কাদামাটি ও পলি জমে থাকায় সেখানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগছে বলে সসিটিভিকে জানিয়েছেন একজন উদ্ধারকারী।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং নিখোঁজদের সন্ধানে সর্বাত্মক অভিযান এবং গৌণ বিপর্যয় এড়াতে কঠোর পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতার নির্দেশ দিয়েছেন।
নেপালের জ্বালানি মন্ত্রক জানিয়েছে, আকস্মিক বন্যায় বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ (৪৩০ মেগাওয়াট) সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধার কাজে নেমেছে এবং নদী তীরের বাসিন্দাদের বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সব ধরনের মানবিক সাহায্য প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন। দুই দেশের উদ্ধারকর্মীরা যৌথভাবে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভতে কোশী নদী নেপালের ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিশে ভারতে গান্ধক নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। গত বছরও তিব্বতের একটি হিমবাহসংলগ্ন হ্রদ ফেটে সৃষ্টি হওয়া একই নদীর বন্যায় ৯ জন নিহত, ২৪ জন নিখোঁজ এবং ভারত-চীন মৈত্রী সেতু ভেসে গিয়ে মাসব্যাপী বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছিল।






