চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকায় পৈতৃক সম্পত্তি দখলের চেষ্টা, ঋণসংক্রান্ত মামলায় তথ্য গোপন ও জালিয়াতি, অবৈধ নিলাম এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ তুলেছেন একটি পরিবারের সদস্যরা।
তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মালিকানাধীন ও ভোগদখলে থাকা প্রায় ১১ গণ্ডা সম্পত্তি নিয়ে একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধ চলছে। সম্প্রতি ওই সম্পত্তি দখলের চেষ্টায় ৩০০ থেকে ৪০০ জনের একটি দল হামলা চালিয়ে কয়েকটি বসতঘর ও ফ্ল্যাটে ভাঙচুর এবং স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুট করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের জন্য দেওয়া লিখিত বক্তব্যে পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, নিলামগ্রহীতা কিংবা অভিযুক্ত অন্য পক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
১৯৬১ সাল থেকে ভোগদখলের দাবি
লিখিত বক্তব্যে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, আরএস রেকর্ডীয় মালিক আব্দুল মোহাম্মদের কাছ থেকে ক্রয়সূত্রে তাদের বাবা সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে বিএস জরিপের ৩১৩ নম্বর খতিয়ানে তারা রেকর্ডীয় মালিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সাল থেকে তারা ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন। সর্বশেষ ২০২৬ সাল পর্যন্ত তাদের নামে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই সম্পত্তিতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অনুমোদিত নকশা এবং ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
সিডিএর অধিগ্রহণ নিয়ে বিরোধ
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৯২ সালে চাক্তাই খাল সম্প্রসারণের সময় সিডিএ তাদের কিছু জমি অধিগ্রহণ করে এবং ক্ষতিপূরণের নোটিশ দেয়। তখন আরএস রেকর্ডীয় মালিক আব্দুল মোহাম্মদের নাতি আব্দুল মাবুদ ওই সম্পত্তিতে নিজের স্বত্ব দাবি করে জেলা প্রশাসকের কাছে আপত্তি জানান।
পরিবারটির দাবি, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় উভয় পক্ষের দলিলপত্র ও নথি যাচাই এবং সরেজমিন তদন্তের পর আব্দুল মাবুদের দাবিকৃত স্বত্বের ভিত্তি নেই বলে সিদ্ধান্ত দেয় এবং তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
ব্যাংক ঋণে সম্পত্তি বন্ধক দেওয়ার অভিযোগ
পরিবারটির অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে আব্দুল মাবুদ অগ্রণী ব্যাংকের চকবাজার শাখা থেকে ‘চিশতিয়া হক স্টোর’-এর নামে দুই লাখ টাকার ঋণ নেন। ওই ঋণের তৃতীয় পক্ষের গ্যারান্টার হিসেবে তাদের সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয় বলে দাবি তাদের।
তাদের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে আরএস বা বিএস রেকর্ড না থাকা এবং সম্পত্তিতে তার কোনো দখল না থাকার পরও কীভাবে ওই জমি ব্যাংকে বন্ধক রাখা হলো এবং ব্যাংক কীভাবে তা গ্রহণ করল।
২০১২ সালে ঋণ পরিশোধের পরও ২০২৫ সালে নিলামের অভিযোগ
লিখিত বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়, ঋণসংক্রান্ত মামলায় ওয়ারেন্ট জারির পর আব্দুল মাবুদ ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ব্যাংকে ৫ লাখ ৪১ হাজার ১৬১ টাকা পরিশোধ করেন। পরে অর্থঋণ আদালত ২০১২ সালের ২৬ জুলাইয়ের আদেশে সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি জারি মামলা সম্পূর্ণ সন্তুষ্টিতে নিষ্পত্তি করে।
তবে পরিবারের অভিযোগ, প্রায় ১৩ বছর পর ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ওই মামলায় নতুন করে একটি আদেশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাদের কোনো নোটিশ না দিয়েই নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তাদের দাবি, নিলামের বিজ্ঞপ্তি বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে প্রকাশের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত অপরিচিত দুটি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। পরে চৌধুরী সানিয়া আলম নামের এক ব্যক্তি মাত্র ২০ লাখ টাকায় চকবাজারের পাশের প্রায় ১১ গণ্ডা জমি, তিনটি ভবন, টিনশেড কলোনি ও গ্যারেজসহ সম্পত্তি নিলামে কিনেছেন বলে তারা অভিযোগ করেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সম্পত্তিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা।
নিলামের তফসিল নিয়েও প্রশ্ন
পরিবারটির দাবি, ব্যাংকের দেওয়া নিলাম তফসিলে ছয়টি আরএস দাগে মোট ২১ দশমিক ৬৭ শতক জমি বিক্রির কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট ছয় দাগে রেকর্ড অনুযায়ী মোট জমির পরিমাণ ১২৩ শতক।
কোন দাগের কোন অংশে নিলামের সম্পত্তি অবস্থিত, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ বা চৌহদ্দি তফসিলে উল্লেখ ছিল না বলেও তারা দাবি করেন। সরেজমিনে গিয়ে জায়গা চিহ্নিত বা সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি এবং এ বিষয়ে তাদের কোনো নোটিশও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
সশস্ত্র হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে একটি দল সেখানে প্রবেশ করে প্রায় ৮০টি পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা করে। পরে বিরোধপূর্ণ জমিতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৫ ধারায় মামলা করা হলে চকবাজার থানাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপরও গত রোববার চৌধুরী সানিয়া আলমের নেতৃত্বে ৩০০ থেকে ৪০০ জনের একটি দল ওই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায় বলে অভিযোগ করা হয়। পরিবারের দাবি, এ সময় কয়েকটি ফ্ল্যাটের দরজা ও আলমারি ভাঙচুর করা হয় এবং প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকার ও ১০ লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ছাড়া বৃদ্ধ, নারী, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ওপর হামলা এবং দারোয়ান রহিমকে মারধর করে রক্তাক্ত করার অভিযোগও করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছে পরিবারটি।
ছয়টি প্রশ্ন পরিবারের
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—বিএস খতিয়ানে তাদের নামে রেকর্ড থাকা সম্পত্তি অন্য ব্যক্তি কীভাবে নিজের বলে দাবি করেন; দখল বা রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ওই সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক রাখা হলো; ২০১২ সালে নিষ্পত্তি হওয়া মামলা ২০২৫ সালে কীভাবে নিলামের পর্যায়ে গেল; নির্দিষ্ট চৌহদ্দি ছাড়া কীভাবে সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া হলো এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও ১৪৫ ধারার আদেশ থাকা অবস্থায় কীভাবে সেখানে প্রবেশ ও দখলের চেষ্টা করা হলো।
পরিবারটি আরও অভিযোগ করে, হামলার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি।
সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরাপত্তার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, কথিত জালিয়াতি ও সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং তাদের পৈতৃক বসতবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
একই সঙ্গে বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের সহযোগিতাও কামনা করেন তারা।






