যুদ্ধের উত্তাপ আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত—দুই দিকের চাপ একসঙ্গে পড়েছে বিশ্ব নৌ-বাণিজ্যে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জুলাই ও আগস্টে পণ্য পরিবহনের ব্যয় রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। এতে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রভাব একসঙ্গে নৌপরিবহন খাতে পড়েছে।
পণ্য পরিবহনের ভাড়া ও বাজারদর পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাসের তথ্য বলছে, পানামা খাল, রাইন নদী, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে জাহাজ পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি পরিবহনে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অনেক জাহাজকে দীর্ঘ ও বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি পরিবহনের সময় ও খরচ—দুটিই বাড়ছে।
একইভাবে বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতেও নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বাজারে তেল পরিবহনের ভাড়া রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আর্গাসের হিসাবে, ১০ আগস্ট এ রুটে তেল পরিবহনের ভাড়া ব্যারেলপ্রতি ১৫ ডলার ২২ সেন্টে ওঠে। ২০০৫ সালে এই ভাড়ার হিসাব সংরক্ষণ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ।
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, কৃষ্ণ সাগরেও সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ পথে ভূমধ্যসাগরের দিকে ট্যাংকার পরিবহনের ভাড়া ২০০৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
ফলে যুদ্ধের প্রভাব নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকছে না। একটি নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার চাপ পড়ছে অন্য রুটগুলোর ওপরও। এতে পুরো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নৌ-বাণিজ্যের এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও এল নিনোর প্রভাবে পানামা খালে পানির স্তর কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংকট তৈরি হওয়ায় পানামা খালের ওপরও চাপ বেড়েছে। ফলে খালের লক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্লট পেতে জাহাজ মালিকদের গুনতে হচ্ছে বিপুল অর্থ।
আগস্টের শুরুতে পানামা খালের দুই সেট লকের জন্য নির্ধারিত স্লটের দাম যথাক্রমে ১১ লাখ ও ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছায়। আর্গাসের তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়।
ইউরোপেও খরার প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনে। জার্মানির শিল্পাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাইন নদীতে পানির স্তর কমে যাওয়ায় বার্জে পণ্য পরিবহনে সক্ষমতা কমেছে।
ফলে কোলোন, ডুইসবার্গ, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কার্লসরুহের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পণ্য পৌঁছানোর খরচ বেড়েছে। এসব রুটে বার্জ পরিবহনের ভাড়া ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বেলজিয়ামের জাহাজ পরিবহন কোম্পানি সিএমবি টেকের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার স্যাভেরিস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ফ্রেইট রেট বুম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, পরিবহন ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে আর্গাসের ইউরোপীয় ফ্রেইট মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান জন ওলেট মনে করেন, নৌপরিবহন খাতে সাম্প্রতিক বিঘ্ন অতীতের বড় সংকটগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তার মতে, কভিড-১৯ মহামারি কিংবা রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময় যে ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়েও গুরুতর হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নৌপথে পরিবহন ব্যয় দীর্ঘদিন বেশি থাকলে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ের দামে। অর্থাৎ সমুদ্রপথের এই সংকট শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়ে দিতে পারে।







