‘টাইটানিক’ দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নতুন মাত্রা পায়। ওই দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে নৌ নিরাপত্তা আইন, বিধিমালা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা হয়। সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা (আইএমও) সমুদ্রযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রটোকল ও কনভেনশনও যুগোপযোগী করেছে।
বাংলাদেশের নৌপথ ও চট্টগ্রাম বন্দরের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নৌ দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ দুটি—নৌযানের কাঠামোগত ও প্রকৌশলগত ত্রুটি এবং নৌ আইন না মানার প্রবণতা। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে কারিগরি ত্রুটিযুক্ত কনটেইনার জাহাজ ‘সিএনএস ইউরেনাস’ ভেড়ানোর ঘটনাটি এ বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
গত ৭ আগস্ট কারিগরি ত্রুটিযুক্ত জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করে। বন্দর অভিমুখী যাত্রাপথে কোনো জাহাজ আকস্মিকভাবে অচল হয়ে পড়লে কিংবা স্টিয়ারিং বা ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে বন্দরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়; নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও সমান দায়িত্ব রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং প্রতিবছর গড়ে প্রায় চার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ এখানে আসা-যাওয়া করে। ফলে বন্দরের চ্যানেলে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে এর প্রভাব শুধু বন্দর কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি-রপ্তানি, পরিবেশ ও জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। বিশেষ করে গুপ্তখাল ও নৌবাহিনীর স্থাপনার কাছাকাছি এলাকায় প্রবল স্রোতের কারণে বড় জাহাজ চলাচলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এসব এলাকায় নিরাপদে চলাচলের জন্য জাহাজের শক্তিশালী ইঞ্জিন, কার্যকর স্টিয়ারিং ব্যবস্থা এবং দক্ষ নাবিক অপরিহার্য। সেদিন ‘সিএনএস ইউরেনাস’ চ্যানেলে আটকে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারত। একই সঙ্গে জাহাজের তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তেল ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ও ঘটতে পারত।
দুর্ঘটনাকবলিত মার্চেন্ট জাহাজ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক স্যালভেজ কনভেনশনের আলোকে এ ধরনের জটিল উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল সবসময় আমাদের হাতে থাকে না। অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর জেটিতে ‘এমভি সাউদার্ন কুইন’ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় উদ্ধার কার্যক্রমে পরিবেশ দূষণ রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হয়েছিল। ভবিষ্যতেও এ ধরনের দুর্ঘটনায় উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানকে কঠোর তদারকির আওতায় রাখা জরুরি।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, বহির্নোঙরে লাইটারিংয়ের খরচ কমাতে কিছু আমদানিকারক ওভারড্রাফটের জাহাজ বন্দর চ্যানেলে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেন। এ ধরনের প্রবণতা শুধু নৌ নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে না, পুরো বন্দর ব্যবস্থাপনাকেও বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়। তাই এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ রাখা উচিত নয়।
চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের বিকল্প নেই। অতীতে কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের মাধ্যমে ওভারড্রাফটের জাহাজ, আইন অমান্যকারী নৌযান এবং দূষণকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। দেশি-বিদেশি বহু জাহাজকে জরিমানা ও আটক করা হয়েছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাস্টার ও ক্রুকেও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইভাবে চ্যানেলে যত্রতত্র ইনল্যান্ড জাহাজ নোঙর করার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিকভাবে বহু প্রটোকল, কনভেনশন ও কোড কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে সেফটি অব লাইফ অ্যাট সি, লোডলাইন কনভেনশন, টনেজ কনভেনশন, সিভিল লায়াবিলিটি কনভেনশন, স্ট্যান্ডার্ড ট্রেইনিং, সার্টিফিকেশন অ্যান্ড ওয়াচকিপিং এবং আইএসপিএস কোড উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশেরও নিজস্ব নৌ আইন রয়েছে। কিন্তু আইন ও বিধিমালা থাকার পরও প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
‘সিএনএস ইউরেনাস’–এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাহাজটির স্টিয়ারিং গিয়ারের হাইড্রোলিক অ্যালার্ম সিস্টেমের ত্রুটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে অবহিত না করা। এ ধরনের তথ্য গোপন করে ত্রুটিপূর্ণ জাহাজ বন্দরে পাঠানো নৌ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশের মার্চেন্ট শিপিং অর্ডিন্যান্স-১৯৮৩ অনুযায়ী এ ধরনের ত্রুটির ক্ষেত্রে জাহাজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ‘সিএনএস ইউরেনাস’-এর বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা ইতিবাচক। এ ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে জাহাজ মালিক, এজেন্ট ও অপারেটরদের নিরাপত্তা বিধি মানতে আরও সতর্ক করবে। তবে শুধু জরিমানা নয়, নিয়মিত পরিদর্শন, তথ্য যাচাই এবং ত্রুটিপূর্ণ জাহাজের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দরের পাইলটদের দক্ষতা ও সাহসিকতার বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিকূল আবহাওয়া, উত্তাল সাগর ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ পেরিয়ে পাইলটরা দিনের পর দিন বন্দরকে সচল রাখেন। তাই তাদের দায়িত্বের ঝুঁকি বিবেচনায় একটি মানসম্মত ঝুঁকিভাতা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের দক্ষতা ও সাহসিকতার যথাযথ মূল্যায়ন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত রেখে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। বন্দরের পরিচালনা বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে রেখে প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি আরও বাড়বে।
চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে একটি বড় জাহাজ ডুবে যাওয়া বা আটকে পড়া নিছক একটি নৌ দুর্ঘটনা নয়। এর ফলে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হতে পারে, নৌ-বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি দুর্ঘটনা পুরো জাতীয় অর্থনীতিতে চেইন ইফেক্ট তৈরি করতে পারে।
তাই চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নৌযানের কারিগরি সক্ষমতা যাচাই, আইন প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি, দক্ষ পাইলটিং, দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। ‘সিএনএস ইউরেনাস’-এর ঘটনায় জরিমানা আরোপের মাধ্যমে যে প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা যেন ভবিষ্যতে নৌ নিরাপত্তা ও পোর্ট গভর্ন্যান্সের আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে—এটাই প্রত্যাশা।







