বাংলাদেশের তৈরি পোশাক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ অন্যান্য খাতেও রফতানি বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের শিল্প ও ভোক্তা অর্থনীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু বিদ্যমান বাণিজ্য ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন পণ্য, নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন বীজ আমদানি করছে। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যানোলা তেল আমদানিরও পরিকল্পনা করছে। ব্যবসায়ীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্য ও ভোজ্যতেল শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে এসব পণ্যের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে মূল্য প্রতিযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের পণ্য অন্য দেশ থেকে কম খরচে আমদানি করা সম্ভব হলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাংলাদেশের বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। তাই বাণিজ্য বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগত মানের পাশাপাশি মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যকে শুধু রফতানি ও আমদানির হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দুই দেশের অর্থনীতির আকার, উৎপাদন সক্ষমতা, মাথাপিছু আয় এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করা হলে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে, দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের বাজারও তত বিস্তৃত হবে।
ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে সরকারি পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি ব্যবসায়ী-টু-ব্যবসায়ী বা বিটুবি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশি শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একইভাবে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, বাজারের সম্ভাবনা ও ভৌগোলিক সুবিধা সম্পর্কে মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও আরও বেশি তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।
তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, পাট ও পাটজাত পণ্যে রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পণ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এ জন্য প্রয়োজন মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সক্ষমতা উন্নত করা। শুধু শুল্ক সুবিধা বা বাজারে প্রবেশাধিকার থাকলেই রফতানি বাড়বে না; সময়মতো সরবরাহ ও প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
যৌথ বিনিয়োগও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজারেও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বৈশ্বিক বাজারসংযোগ থেকে উপকৃত হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, সঠিক নীতিসহায়তা, বাণিজ্য সুবিধা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও যৌথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী হলেও নতুন রফতানি খাত ও দেশের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনায় এটি অর্জনযোগ্য বলে মনে করছেন তারা।
এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন পণ্য ও বাজার নিয়ে কাজ করা জরুরি। চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও দুই দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
চট্টগ্রামও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, কাঁচামাল, জ্বালানি ও শিল্পের বিভিন্ন উপকরণ আমদানির পাশাপাশি বাংলাদেশি পণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে। কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নত লজিস্টিকস এবং দ্রুত কাস্টমস সেবা নিশ্চিত করা গেলে এ বাণিজ্য আরও গতিশীল হতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য, বাংলাদেশ যেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি, শিল্পযন্ত্র, বিনিয়োগ ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ব্যবসায়ীদের মতে, পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। নতুন পণ্য, নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি উভয় অর্থনীতিই লাভবান হবে।






