চলমান কাঠামোগত সংস্কার, নীতিগত নমনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমে আসার প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এ আশাবাদের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটকে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা এবং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফিরতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের জন্য সম্প্রতি ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত ২৩ মে গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান ঘোষিত এ প্যাকেজের আওতায় প্রায় ২৫ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্যাকেজের অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পৌঁছানো যায়, সেটিই এখন বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতিতে মিশ্র পরিস্থিতি দেখা গেছে। কৃষি, শিল্প ও সেবা—তিনটি প্রধান খাতেই প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। এতে স্বল্পমেয়াদে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ থাকলেও বৈদেশিক খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশেষ করে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, আর্থিক হিসাবের উন্নতি এবং বিনিময়হারের স্থিতিশীলতা দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এসব কারণে অর্থনীতির বহিঃখাত নিয়ে তুলনামূলকভাবে আশাবাদী বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহের সংকটকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে না। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত ডিসেম্বরেও এ হার ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হওয়া বিঘ্নকে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে উঠেছে। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশে নেমেছে। মজুরিসূচকে কিছুটা উন্নতি হলেও তা এখনো মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে প্রকৃত মজুরি নেতিবাচক থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হয়ে আছে ব্যাংক খাত। তৃতীয় প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর দুর্বল সম্পদমান, মূলধন ঘাটতি এবং কম মুনাফা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তবে ব্যাংক খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখা গেছে। আমানত প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল থাকা এবং অতিরিক্ত বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ (এসএলআর) বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া, ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর সতর্কতা এবং ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, চলমান ব্যাংকিং সংস্কার এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।
তবে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সংস্কারের আওতায় আনা—এই তিনটি বিষয়ই অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে দ্রুত পৌঁছানো গেলে সরকারের উদ্যোগের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থ বিতরণ ও ব্যবহারের ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা কার্যকরভাবে করা গেলে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।







