শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং কার্যক্রমের ধারাবাহিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ‘ট্রিপল এ’ (AAA) ক্রেডিট রেটিং ধরে রাখতে কাজ করছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ব্যাংকটির মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছ পরিচালনা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির কৌশলই এ স্বীকৃতির মূল ভিত্তি।
ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের তদারকি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বাধীন যাচাই-বাছাই এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। বর্তমানে ব্যাংকটি বৃহৎ এটিএম, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে, যা পরিচালন ব্যয় ও ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংকটির মতে, স্বল্পমেয়াদি মুনাফার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির ফলে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ, রক্ষণশীল প্রভিশনিং এবং বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এসব উদ্যোগই আন্তর্জাতিক মানের ক্রেডিট রেটিং ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে।
রেটিং ধরে রাখার বড় চ্যালেঞ্জ খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ
ব্যাংকটির ভাষ্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক মন্দা কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে তা সরাসরি সম্পদের গুণগত মান ও ক্রেডিট রেটিংয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুঁকি-সমন্বিত প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ রেটিংয়ে বাড়ছে আস্থা
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মতে, সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং শুধু মর্যাদার বিষয় নয়, বরং বাস্তব ব্যবসায়িক সুবিধাও এনে দেয়। এর ফলে তহবিল সংগ্রহ সহজ হয়, আন্তর্জাতিক করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্য, এলসি ও রেমিট্যান্স কার্যক্রমে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের আস্থাও বাড়ে।
কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কম খেলাপি ঋণ
ব্যাংকটির দাবি, শিল্পখাতের গড়ের তুলনায় তাদের শ্রেণীকৃত ঋণের হার দীর্ঘদিন ধরেই কম। ঋণ বিতরণের আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে ঋণের মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত ঋণ আদায়ে আপস-মীমাংসা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে।
এআই ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নতুন বিনিয়োগ
আগামী দিনের ব্যাংকিং প্রযুক্তিনির্ভর হবে উল্লেখ করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস, ওপেন ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ক্রেডিট স্কোরিং, জালিয়াতি শনাক্তকরণ ও গ্রাহকসেবায় এআই ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্ট, সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (এসওসি) শক্তিশালীকরণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
সংস্কারে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
ব্যাংকটির মতে, আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। বিশেষ করে ঋণ আদায়-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত করা, বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনালকে আরও কার্যকর করা এবং খেলাপি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক আইন বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
পাঁচ বছরের পরিকল্পনা
আগামী পাঁচ বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ, সিএসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বৃদ্ধি, সবুজ অর্থায়নে বিনিয়োগ, এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং ব্যাংকিং-সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।
এ ছাড়া প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সম্পদের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে সর্বোচ্চ ‘ট্রিপল এ’ ক্রেডিট রেটিং বজায় রাখাও ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সূত্র: বণিক বার্তা






