পর্ব-১
দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের মাঝে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় স্থানীয় খেটে খাওয়া শ্রমিকদের চরম বঞ্চনার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এসেছে। পতেঙ্গার S.A.P.L (সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড) ডিপোতে স্থানীয় দিনমজুরদের বাদ দিয়ে পরিচয় গোপন রেখে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে শত শত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে কর্মহীন হয়ে চরম মানবিক ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন এলাকার শত শত দিনমজুর ও স্থানীয় শ্রমিক।
ডিপোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে শ্রমিকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

শ্রম আইন লঙ্ঘন ও নামমাত্র মজুরিতে শোষণ
সরেজমিনে পতেঙ্গার S.A.P.L ডিপোতে গিয়ে ভুক্তভোগী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে এক বিস্ময়কর তথ্য জানা যায়। কোনো প্রকার বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়াই, এমনকি ১৮ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক রোহিঙ্গাদেরও এখানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দেশের বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে একজন শ্রমিকের মজুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও, ডিপো কর্তৃপক্ষ এই অসহায় রোহিঙ্গাদের দৈনিক ১২ ঘণ্টা খাটিয়ে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দিচ্ছে। প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪ ঘণ্টা খাটিয়ে মাসিক ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেতনে বড় অঙ্কের একটি অর্থ ডিপোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও একটি সিন্ডিকেট আত্মসাৎ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে S.A.P.L-এর পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দৈনিক অর্থনীতিকে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
ক্যাম্প ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে রোহিঙ্গার ঢল
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালে শরণার্থী হিসেবে আসার পর থেকে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণ দেখভালের দায়িত্ব পালন করছে জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকার। নিয়ম অনুযায়ী তাদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পের ভেতরেই থাকার কথা। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ তোয়াক্কা না করে একটি প্রভাবশালী চক্র বেশি মজুরি ও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে এনে এই ডিপোতে কাজে লাগাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সাথে নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
নেপথ্যে প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় দুই প্রভাবশালী ঠিকাদার ইকবাল ও তাহেরের মাধ্যমে দীর্ঘ ২-৩ বছর যাবৎ এই ডিপোতে রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে কাজ করে যাচ্ছে। খোদ রোহিঙ্গা শ্রমিকরাই আলাপকালে এই দুই ঠিকাদারের নাম উল্লেখ করেছেন।
এর ফলে স্থানীয় গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষ চরম বেকারত্বের শিকার হচ্ছেন। চরপাড়ার দিনমজুর মোহাম্মদ নিজাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা অনেকবার S.A.P.L ডিপোতে কাজের জন্য গিয়েছি। কিন্তু আমাদের খুব কম মজুরিতে কাজ করতে বলা হয়। এত কম মজুরিতে কাজ করলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলা অসম্ভব বলেই আমরা কাজ করতে পারছি না।”

অন্যদিকে নাজিরপাড়ার মো. ইকবাল অভিযোগ করে বলেন, “স্থানীয় ঠিকাদার ইকবাল ও তাহের রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই সিন্ডিকেট চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে স্থানীয় শ্রমিকদের বাদ দিয়ে তারা রোহিঙ্গা শ্রমিক দিয়ে ডিপোর কাজ চালাচ্ছে। বর্তমানে S.A.P.L ডিপোতে ডে ও নাইট শিফটে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ রোহিঙ্গা শ্রমিক প্রতিনিয়ত কাজ করছে।”
স্থানীয়দের নিরাপত্তা শঙ্কা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য
স্থানীয়দের দাবি, এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা এলাকায় দলবদ্ধভাবে পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছে। শুধু কাজই নয়, তারা আশেপাশের এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এভাবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তারা ছড়িয়ে পড়লে ভবিষ্যতে এলাকায় বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের কম মজুরিতে খাটানোর ব্যাপারে S.A.P.L ডিপোর সিইও (C.E.O) মজুমদারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আপনাদের কিছু জানার থাকলে তা প্রশ্ন আকারে লিখে আমার মুঠোফোনে পাঠান। লিখিত প্রশ্ন পেলে উত্তর দিতে দুই-তিন দিন সময় লাগবে বলে জানান ।”
এদিকে ডিপোর প্রশাসনিক ইনচার্জ উল্টো ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিকদের মুঠোফোনে বলেন, “রোহিঙ্গারা পুরো আমেরিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে গেছে। আপনারা শুধু আমাদের ডিপো নিয়ে কেন পড়ে আছেন?”

কর্তৃপক্ষের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যে স্থানীয়দের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—বর্তমান পরিস্থিতিতে কাদের ইন্ধনে বা প্রশ্রয়ে এই প্রভাবশালী ঠিকাদাররা এমন আইনবিরোধী কাজ চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে? এটি এখন আর শুধু ভুক্তভোগী শ্রমিকদের প্রশ্ন নয়, বরং পুরো চট্টগ্রামবাসীর কাছে এক বিরাট বিস্ময় ও তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা অবিলম্বে এই অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেশীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
S.A.P.L ডিপোর ভ্যাট-ট্যাক্স অনিয়ম ও নানা অপকর্ম নিয়ে বিস্তারিত আসছে ২য় পর্বে।







