দেশের ক্রমবর্ধমান লজিস্টিকস ও বন্দর খাতে আরও বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের লক্ষ্যে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও অফ-ডক সুবিধায় বিদেশি মালিকানার দীর্ঘদিনের সীমা তুলে দিয়েছে বাংলাদেশ।
গত ১১ জুন জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। আগামী ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হবে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেসরকারি আইসিডি ও অফ-ডক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের শতভাগ মালিকানা রাখতে পারবেন।
খাতসংশ্লিষ্ট অংশীজনরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। তবে তাদের মতে, শুধু মালিকানার বিধিনিষেধ তুলে দিলেই উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ আসবে—এমনটি নিশ্চিত নয়।
এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের লজিস্টিক শিল্পের জন্য একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন। এতদিন বিদেশি অপারেটররা কেবল স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাতে প্রবেশ করতে পারত। সেখানে স্থানীয়দেরই সিংহভাগ মালিকানা থাকত।
নতুন কাঠামোর অধীনে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এখন স্বাধীনভাবে এসব স্থাপনা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে পারবে।
আগামী বছরগুলোতে রপ্তানি ও পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বাড়বে—এমন প্রত্যাশার ভিত্তিতে লজিস্টিকস অবকাঠামোয় নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেসরকারি খাতে পরিচালিত ২৪টি আইসিডি রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশি অংশীদারও যুক্ত রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সংরক্ষণ সক্ষমতা ১ লাখ ৬ হাজার টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট (টিইইউ)। তারা প্রতি মাসে প্রায় ৯০ হাজার রপ্তানি কনটেইনার, ৫০ হাজার আমদানি কনটেইনার এবং ৬০ হাজার খালি কনটেইনার পরিচালনা করতে পারে।
এছাড়া আরও তিনটি আইসিডি নির্মাণাধীন রয়েছে। সেগুলো চলতি বছর বা আগামী বছরের মধ্যে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক বন্দর ও লজিস্টিকস খাতের অপারেটরদের মধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড, মেডলগ, রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি), এপিএম টার্মিনালস এবং পিএসএ সিঙ্গাপুর ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বন্দর, টার্মিনাল ও অফ-ডক খাতে বিনিয়োগ করেছে অথবা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য জাফর আলম মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় অংশগ্রহণ পরিচালনাগত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপারেটররা আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং ব্যবস্থাপনা দক্ষতা নিয়ে আসে। এতে সামগ্রিক কার্যকারিতা ও দক্ষতা বাড়ে।’
তার মতে, বৈশ্বিক লজিস্টিকস কোম্পানির প্রবেশ প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জনশক্তি উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, ‘তারা উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক মানের সেরা চর্চা নিয়ে আসবে। তাদের সঙ্গে কাজ করে স্থানীয় কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।’
তবে তিনি বিদেশি বিনিয়োগ টানতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগের গন্তব্য নির্বাচন করার সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এসব বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।’
জাফর আলম আরও বলেন, ভবিষ্যতে বিদেশি অপারেটরদের সঙ্গে চুক্তিতে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এতে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ সুফল পাবে।
বৃহত্তর বিদেশি বিনিয়োগ কৌশলের অংশ
বিদেশি মালিকানার ওপর থাকা সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার সরকারের বৃহত্তর প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলের অংশ। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশের বাণিজ্য-সহায়ক অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়লে লজিস্টিকস সক্ষমতা সম্প্রসারিত হবে, সেবার মান উন্নত হবে এবং রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
খাতসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংস্কারের ফলে এমন একটি বড় বাধা দূর হয়েছে, যা এতদিন কিছু আন্তর্জাতিক অপারেটরকে বাংলাদেশের ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) খাতে প্রবেশে নিরুৎসাহিত করেছিল।
তবে তাদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং পরিচালনাগত দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—এই নীতিগত উদারীকরণকে বাংলাদেশ বাস্তব ও অর্থবহ বিনিয়োগ প্রবাহে রূপ দিতে পারবে কি না।







