নগরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স–এআই) স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এ লক্ষ্যে ২১৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় ‘চসিকের বিভিন্ন এলাকায় স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নিয়েছে সংস্থাটি। প্রকল্পের আওতায় ৫টি জোনের আওতায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ ৫৩টি মোড় বা ইন্টারসেকশন–এ স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, অ্যাডাপ্টিভ কন্ট্রোল সিস্টেম (পরিস্থিতি–উপযোগী স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) ও আধুনিক নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ট্রাফিক ফ্লো অপ্টিমাইজ করা হবে। অর্থাৎ রাস্তায় যখন যেদিকের গাড়ির চাপ বাড়বে বা কমবে, প্রযুক্তি নিজে থেকেই সেই অবস্থা বুঝে ট্রাফিক লাইটের সময় পরিবর্তন করবে এবং পুরো শহরে গাড়ি চলাচলকে জ্যামমুক্ত ও গতিশীল রাখবে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রকল্পের প্রাথমিক একটি উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করেছে। বর্তমানে ওই ডিপিপি’র সংযোজন–বিয়োজন–এর কাজ চলছে। চূড়ান্ত করে চলতি মাসেই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরে আধুনিক, নিরাপদ, স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস, গণপরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা ডিজিটাল নজরদারি শক্তিশালীকরণ এবং নাগরিকদের জন্য টেকসই ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছেন চসিকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এআই–ভিত্তিক স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের যানজট, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা এবং সড়কে আইন অমান্যের প্রবণতা কমাতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পভুক্ত প্রধান ইন্টারসেকশনসমূহ : ৫টি জোন বা এরিয়ার আওতায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা ইন্টারসেকশন’কে প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। এরিয়াগুলো হচ্ছে– সেন্ট্রাল ও কমার্শিয়াল এরিয়া ইন্টারসেকশন, রেলওয়ে ও ট্রানজিট হাব এরিয়া, আবাসিক এবং সমপ্রসারিত এলাকা, আগ্রাবাদ ও পোর্ট এরিয়া, উত্তর ও হাইওয়ে সংযোগ।
এর মধ্যে সেন্ট্রাল ও কমার্শিয়াল এরিয়া ইন্টারসেকশন’গুলো হচ্ছে– জিইসি মোড়, ২ নম্বর গেট মোড়, মুরাদপুর মোড়, বহদ্দারহাট মোড়, ষোলশহর ২ নম্বর গেট সার্কেল, ওয়াসা মোড়, লালখান বাজার মোড় ও টাইগারপাস মোড়। রেলওয়ে ও ট্রানজিট হাব এরিয়ার ইন্টারসেকশন’গুলো হচ্ছে– স্টেশন রোড মোড়, কদমতলী মোড় ও অঙিজেন মোড়।
আবাসিক এবং সমপ্রসারিত এলাকার ইন্টারসেকশন’গুলো হচ্ছে– হালিশহর বাজার মোড়, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কালুরঘাট সেতু মোড়, চকবাজার মোড়, আন্দরকিল্লা মোড় ও জামালখান মোড়।
আগ্রাবাদ ও পোর্ট এরিয়ার ইন্টারসেকশন’গুলো হচ্ছে– আগ্রাবাদ অ্যাঙেস রোড মোড়, বাদামতলী মোড়, বারিক বিল্ডিং মোড়, নিউ মার্কেট মোড়, কাস্টম হাউস বা এনবিআর মোড় ও সিইপিজেড গেট মোড় (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল)।
উত্তর ও হাইওয়ে সংযোগ পয়েন্টে–এর ইন্টারসেকশন’গুলো হচ্ছে– এ কে খান মোড়, ফৌজদারহাট মোড় ও সিটি গেট (পোর্ট কানেক্টিং রোড জাংশন)।
প্রকল্পের সুৃবিধা : প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মোড় বা ইন্টারসেকশন’গুলোতে স্মার্ট সিগন্যাল, ট্রাফিক ফ্লো মনিটরিং ক্যামেরা, আইন লঙ্ঘন শনাক্তকারী ক্যামেরা, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, রেড সিগন্যাল ডিটেক্টর এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে।
জানা গেছে, নতুন এই এআই ট্রাফিক সিস্টেমে প্রতিটি মোড়ে হাই–টেক ‘ট্রাফিক ফ্লো ক্যামেরা’ এবং ‘ভায়োলেশন ক্যামেরা’ সংযুক্ত থাকবে। এর ফলে ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জংশনগুলোতে গাড়ির সংখ্যা বা ভলিউম মাপা সম্ভব হবে। কেউ স্টপ–লাইন অমান্য করলে কিংবা লাল বাতি সংকেত অমান্য করে গাড়ি চালালে এআই ক্যামেরা তা তাৎক্ষণিকভাবে ধরে ফেলবে এবং আইন প্রয়োগকারী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম, সার্ভার, নেটওয়ার্ক স্টোরেজ, রিয়েল–টাইম মনিটরিং অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন, গণপরিবহণ স্টপেজ ও পার্কিং ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হবে। ট্রাফিক পুলিশ, কন্ট্রোল রুম অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট জন প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড ও রিয়েল–টাইন ট্রাফিক মনিটরিং ও রেসপন্স সিস্টেম চালু করা হবে।
চসিকের তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়ব আজাদীকে বলেন, প্রকল্পের আওতায় সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে যানজট হ্রাস, সড়ক নিরাপত্তা উদ্যান, গণপরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই নগর চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
জানা গেছে, নগরে চসিকের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে প্রথমবার ৩৯টি মোড়ে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আরো ৫টি মোড়ে নতুন করে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে দেড় কোটি টাকা খরচ করে ‘বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় সেই ৪৪টি ট্রাফিক সিগন্যাল বাতির মধ্যে ২৫টি সিগন্যালের উন্নয়ন, মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল। যা পরবর্তীতে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
মোড়গুলো হচ্ছে– মুরাদপুর, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, ইস্পাহানি মোড়, টাইগার রোড (বায়েজিদ বোস্তামি সেনানিবাসের সম্মুখে), আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়, নিউ মার্কেট মোড়, সিএমপি মোড় এবং কাজীর দেউড়ি মোড়, টাইগার পাস, বারিক বিল্ডিং মোড়, পোর্ট কানেকটিং মোড়, সল্টগোলা মোড়, ইপিজেড মোড়, নেভি হাসপাতাল মোড়, সিমেন্ট ক্রসিং মোড়, পাঠানটুলি মোড়, আন্দরকিল্লা মোড়, জামাল খান ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মোড়, বৌদ্ধ মন্দির মোড়, প্রবর্তক মোড়, রাহাত্তারপুল মোড়, কালামিয়া বাজার মোড় এবং রাজাখালি মোড়।






