আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় তেল খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত বার্তায় ঘনঘন পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন। এর ফলে বাজারের তারল্য ও লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাজার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের ওপেন ইন্টারেস্ট বা সক্রিয় চুক্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এটি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি গ্রহণে অনীহারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লন্ডন ও নিউইয়র্কের তেল ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ইরানকে কেন্দ্র করে কখনো কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত, আবার কখনো সমঝোতার সম্ভাবনার কথা সামনে আসায় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগের পরিবর্তে অপেক্ষা করার কৌশল বেছে নিচ্ছেন।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক বার্তা আসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কয়েক শতাংশ কমে যায়। এতে বাজারে বিক্রির চাপও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা কমে গেলে দামের ওঠানামা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ তখন তুলনামূলক কম লেনদেনও বাজারমূল্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে মুনাফার সুযোগ যেমন বাড়ে, তেমনি লোকসানের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
তাদের মতে, বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা সরবরাহ পরিস্থিতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নীতিগত ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগ প্রবাহ ধীর হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হয়নি। সামরিক উত্তেজনা থাকলেও তেল পরিবহন স্বাভাবিক রয়েছে এবং প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানিতেও উল্লেখযোগ্য বাধা দেখা যায়নি।
দ্বিতীয়ত, ওপেক প্লাসভুক্ত দেশগুলোর হাতে এখনো অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। ফলে কোনো একটি উৎস থেকে সরবরাহ কমে গেলেও অন্য দেশগুলো তা আংশিকভাবে পূরণ করতে পারবে বলে বাজারে ধারণা রয়েছে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল। ইউরোপের শিল্প খাতের ধীরগতি, চীনের মন্থর পুনরুদ্ধার এবং উচ্চ সুদের হার ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দাম বাড়ার প্রত্যাশায় অবস্থান নেওয়া অনেক বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে শুরু করায় বাজারে বিক্রির চাপ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে তেলের বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে মূলত সরবরাহ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অবস্থা।
যদি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমে আসে এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল অব্যাহত থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কিছুটা কমতে পারে। বিপরীতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আর বড় ধরনের সংঘাত না ঘটলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে বাজারে অস্থিরতা ও দামের ওঠানামা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সরবরাহ ও চাহিদা নয়, রাজনৈতিক বার্তা এবং কূটনৈতিক তৎপরতাও তেলের দামের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে বাজারে সতর্ক অবস্থানই বিনিয়োগকারীদের প্রধান কৌশল হয়ে থাকবে।







