হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানি করা উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি যদি দীর্ঘমেয়াদে অবরুদ্ধ বা বন্ধ থাকে, তাহলে যেন এটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখা যায়—সেই লক্ষ্যেই এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (কেপিসি) আন্তর্জাতিক বিপণন বিষয়ক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ খালেদ আহমদ আল-সাবাহ জানান, কুয়েত তাদের উৎপাদিত তেল বিশ্ববাজারের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সম্ভাব্য পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করছে, যা এই দুই দেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে যাবে।
গতকাল বুধবার লন্ডনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শেখ খালেদ বলেন, “কুয়েত বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সাথে আলোচনা ও সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।” তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের ওপর ইরানি হুমকির কারণে, এই পাইপলাইন প্রকল্পের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এখন নতুন করে সামনে আসছে।
তিনি আরও বলেন, “আগে অনেকেই ভাবতেন, মানুষ কেন কোনো ব্যবহার ছাড়াই বা শুধু ফেলে রাখার জন্য পাইপলাইন তৈরি করছে? কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই পাইপলাইনগুলোর আসল উপযোগিতা প্রমাণ করে দিচ্ছে।”
ইরান এই জলপথটিকে তাদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করার পর এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করায়— তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার রপ্তানিও থমকে পড়েছে। যুদ্ধ চলমান থাকায় অব্যাহত ক্ষতি গুনতে হচ্ছে রাজস্বের।
এমন প্রেক্ষাপটে, উপসাগরীয় দেশগুলোর এই ব্যয়বহুল অবকাঠামোগত বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করার বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা একটি আপৎকালীন বিকল্প খুঁজছে, কারণ ইরান ইতিমধ্যে এই প্রণালীটিকে জিম্মি করার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
কিন্তু, যদি এই সংঘাতের অবসান ঘটে এবং জাহাজগুলো যদি আবারো হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধে চলাচল করতে পারে—তাহলে এই ধরনের অত্যন্ত ব্যয়বহুল পাইপলাইন প্রকল্পের প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন বা আগ্রহ আবারো কমে যেতে পারে।
এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে কেবল সৌদি আরব ও আমিরাতের নিজস্ব পাইপলাইন রয়েছে, যা দিয়ে অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভর না করেই হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত বন্দরগুলোতে সরাসরি তেল পরিবহন করতে পারে তারা। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উভয় দেশই এই পাইপলাইনগুলোর ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
নতুন কোনো পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা চলছে কি না, সে বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্য দেশগুলোকে এই বিকল্প সুবিধা ব্যবহার করতে হলে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। আলোচনাধীন প্রস্তাব অনুযায়ী, তেল সৌদি আরব এবং আমিরাতের বন্দরগুলোয় লোড করা হবে এবং সেখান থেকে এমন গন্তব্যে পাঠানো হবে যার সাথে হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত বন্দরগুলোতে তেল পাম্প করার পাইপলাইন সুবিধা যুক্ত রয়েছে।
গত মঙ্গলবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডনক) ট্রেডিং বিষয়ক এক্সিকিউটিভ ভাইস-প্রেসিডেন্ট ফিলিপ খুরি বলেন, আমিরাত অপরিশোধিত তেলের জন্য একটি নতুন “ওয়েস্ট-ইস্ট পাইপলাইন” নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। অতীতে যখন এধরনের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তখনও এটিকে উপসাগরীয় অন্যান্য উৎপাদক দেশের জন্য হরমুজ প্রণালী এড়ানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা হয়েছিল। এর বিনিময়ে পাইপলাইন যেসব দেশের ওপর দিয়ে যাবে, তারা একটি নির্দিষ্ট টোল পাবে।
কিন্তু অতীতে বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও—তা কখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং এর ফলে তৈরি হতে পারে এমন সম্ভাব্য কৌশলগত নিরাপত্তা দুর্বলতার আশঙ্কায়, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সুবিধাজনক অনেক প্রকল্পই অতীতে মাঝপথে থমকে গেছে।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এই ধরনের প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতাকে এবার আরও জোরালো করেছে। শেখ খালেদ বলেন, ইরানের আচরণের চরম অনিশ্চয়তার কারণে কুয়েত আর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করার ঝুঁকি নিতে পারছে না। গত রাতেও ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শেখ খালেদ আরও জানান, কুয়েত হরমুজ প্রণালীর ওপারে সম্ভাব্য তেল মজুত বা বড় স্টোরেজ সাইট গড়ে তোলার বিষয়ে ওমানের সাথেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।






