রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আর্মড সার্ভিসেস কমিটি গত মঙ্গলবার তাদের বহুল প্রতীক্ষিত বার্ষিক প্রতিরক্ষা নীতি বিলের প্রথম খসড়া প্রকাশ করেছে। এতে আগামী অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ১ দশমিক ১৪ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ১৪ হাজার কোটি) মার্কিন ডলারের সামরিক ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিলটি বর্তমান পর্যায়ে কমিটির যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের অগ্রাধিকারগুলোর একটি রূপরেখা মাত্র। তবে এতে মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর- পেন্টাগন যে হাজার হাজার গোলাবারুদ ও অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা দ্রুত পূরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় এই লক্ষ্যটি এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
এই বিশাল অংকের বাজেট পেন্টাগনের নিখুঁত নিশানার অস্ত্রের (প্রিসিশান ওয়েপন্স) ভান্ডার দ্রুত সম্প্রসারণ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের আহ্বানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ট্রাম্পের এসব বিশেষ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং নৌবাহিনীর জন্য নতুন শ্রেণির যুদ্ধজাহাজের একটি বহর তৈরি করা।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ অনুরোধে কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেটকে দুটি পৃথক বিলে ভাগ করার পরিকল্পনা করছেন। এর মধ্যে জাহাজ নির্মাণ ও গোলাবারুদ তৈরির মতো প্রশাসনের নিজস্ব অগ্রাধিকার খাতের জন্য প্রস্তাবিত আরও ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজেট— ‘রিকনসিলিয়েশন’ নামক একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলাদাভাবে আলোচনা ও ভোটের জন্য পেশ করা হবে। এই কৌশলের ফলে রিপাবলিকানরা মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়াই এই ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজটি পাস করিয়ে নিতে পারবে; অন্যথায় সাধারণ নিয়মে যেকোনো আইন পাসের জন্য সিনেটে ন্যূনতম ৬০টি ভোটের প্রয়োজন পড়ে।
তবে প্রশাসনের এই কৌশল নিয়ে খোদ কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাই প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের যুক্তি, পেন্টাগনের বার্ষিক মূল বাজেটের তুলনায় এই রিকনসিলিয়েশন প্যাকেজটি ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি, যা শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামরিক কর্মসূচিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
চলতি গ্রীষ্মের শেষের দিকে মার্কিন সিনেটের আইনপ্রণেতারা এই বিলের নিজস্ব সংস্করণ পেশ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর মার্কিন পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ— প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে নিজ নিজ বিল পাস করাতে হবে এবং চলতি বছরের শেষের দিকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দুটি বিলকে সমন্বয় করে একটি একক আইনে রূপ দিতে হবে।
ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে যখন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের মধ্যেই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে, ঠিক তখনই এই বিলটি আনা হলো। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন পাঁচ বছরে পদার্পণ করা সত্ত্বেও—পেন্টাগন ইউরোপে মোতায়েন সেনাসংখ্যা কমিয়ে দেওয়ায় ডেমোক্র্যাট এবং অনেক রিপাবলিকান সদস্যই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
চলতি মে মাসের শুরুর দিকে পেন্টাগন জার্মানি থেকে ৫,০০০ সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এক বিবৃতিতে ইরান যুদ্ধ অবসানের আলোচনা চলাকালে তেহরান ওয়াশিংটনকে “অপদস্থ” করেছে বলে মন্তব্য করার পরপরই পেন্টাগন এই সেনা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেয়।
এর কিছুদিন পরই পেন্টাগন আকস্মিকভাবে পোল্যান্ডে একটি আর্মি ব্রিগেড মোতায়েনের পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে— প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরবর্তীতে পোল্যান্ডে আরও ৫,০০০ অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেন।
গত মঙ্গলবার প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত এই বিলে এমন কিছু আইনি শর্ত বা ভাষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা গত বছরই প্রথম কংগ্রেসে অনুমোদিত হয়েছিল। এই শর্ত অনুযায়ী, ইউরোপে মার্কিন সেনার সংখ্যা ৭৬,০০০-এর নিচে নামানোর আগে পেন্টাগনকে অবশ্যই একটি বিস্তারিত ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
প্রতিনিধি পরিষদের এই বিলে পেন্টাগনের জন্য আরও একটি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। সেনা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে পেন্টাগনকে অবশ্যই প্রত্যয়ন করতে হবে যে, প্রত্যাহার করা অতিরিক্ত সেনাদের ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে সেনা মোতায়েন রাখা হলে তা ন্যাটোভুক্ত অঞ্চলে রাশিয়ার সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কমিটির নিজস্ব গোপনীয়তার নিয়মের অধীনে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান সহকারী জানিয়েছেন, পেন্টাগনের সাম্প্রতিক সেনা প্রত্যাহারের পদক্ষেপগুলোর পরও – ইউরোপে মার্কিন সেনার সংখ্যা নির্ধারিত ন্যূনতম ৭৬,০০০-এর নিচে নামেনি।
তবে ওই কর্মকর্তা পূর্বাভাস দিয়ে বলেছেন, আগামী সপ্তাহে এই বিলের সংশোধনীগুলোর ওপর ভোট দেওয়ার জন্য যখন পুরো কমিটি বৈঠকে বসবে, তখন মঙ্গলবার উত্থাপিত এই ধারা বা বিধানগুলোকে আরও বেশি কঠোর ও বাধ্যতামূলক করার পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তিনি আরো বলেন, “ইউরোপে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থানের বিষয়ে কমিটির অনেক সদস্যই অত্যন্ত কঠোর ও দৃঢ় মনোভাব পোষণ করেন।”






