দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকায় নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।

চট্টগ্রাম বিভাগে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পাঁচ জেলার ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার ১৬ উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মোট ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।
বন্যার্তদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
গতকাল বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুর্গম উপকূলীয় অনেক ইউনিয়নে এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাতকানিয়ার কাছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একটি অংশ বৃহস্পতিবার থেকে পানির নিচে রয়েছে। যান চলাচল এখনো চালু থাকলেও পানি আরও বাড়লে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকটেও পড়েছেন বাসিন্দারা।

ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান জানান, তার ইউনিয়নের অন্তত পাঁচটি ওয়ার্ড পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে।
তিনি বলেন, “অনেক এলাকায় কোমর থেকে গলা সমান পানি। প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে এক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বন্যার পানির কারণে তা এখনো আনা সম্ভব হয়নি।”
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, চার লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন।
পাশের বাঁশখালী উপজেলায়ও বন্যার পানি ১৪টি ইউনিয়নেই ছড়িয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া ও গুণাগরী ইউনিয়নে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, হাজার হাজার কাঁচাঘর ধসে পড়েছে। টানা তিন দিন ধরে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও বাড়ছে।
বাহারছড়ার বাসিন্দা শাহেদ হোসেন বলেন, দুর্গম কয়েকটি ইউনিয়নে এখনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি।
কক্সবাজারেও বন্যায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এতে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নলকূপগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক বাড়িতে কোমর থেকে বুকসমান পানি উঠেছে এবং রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় বহু পরিবার রান্না করতে পারছে না।

এদিকে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাঙ্গামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ডুবে যাওয়া সড়কগুলো নৌকায় পার করে দেওয়ার পর তারা সড়কপথে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন।
নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকায় বান্দরবান জেলা প্রশাসন জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সময় আরও তিন দিন বাড়িয়েছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলো ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
খোয়াইয়ের বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের তিন উপজেলার চার ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়।
বাঁধ ভেঙে সদর উপজেলার লস্করপুর ও পইল ইউনিয়ন, বাহুবল উপজেলার লামাতাশি ইউনিয়ন এবং বানিয়াচং উপজেলার বিক্রমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পানি বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে গেছে।

বানিয়াচংয়ের রাধাপুরেও বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করেছে। এতে আশপাশের হাওর এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বন্যার পানি। অন্যদিকে মছুলিয়া পয়েন্টে শহররক্ষা বাঁধ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ রক্ষায় কাজ করছেন।
এদিকে হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। পানি বেড়ে যাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশ তলিয়ে গেছে, ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পানির উচ্চতা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে টানা বৃষ্টিতে বাগেরহাটেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চল ও কয়েকটি সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে।
উপকূলীয় জেলাজুড়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর মোংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রেখেছে।
গত পাঁচ দিনের টানা অতি বৃষ্টির কারণে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চকরিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজারসহ সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গত মানুষ শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় পানি ও জরুরি চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
এইসব সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে আমি দৈনিক অর্থনীতির সম্পাদক আহমেদ কবির মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্যার্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হোক এবং সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও বন্যাদুর্গত পরিবারের পুনর্বাসনে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
সম্পাদক/দৈনিক অর্থনীতি







