অনেক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার স্নায়ুযুদ্ধের আমলের পুরনো ও অবিস্ফোরিত পারমাণবিক ওয়ারহেডগুলোকে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এবার একটি বড় চুক্তি হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির আওতায়, প্রথমবারের মতো পাঁচটি বেসরকারি কোম্পানি ‘অস্ত্র-মানের’ (উইপনস-গ্রেড) প্লুটোনিয়াম ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে—যা দিয়ে তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের (ডিওই) পারমাণবিক শক্তি বিষয়ক কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান- ওকলো ইনকর্পোরেটেড-সহ আরও চারটি কোম্পানিকে তাদের ‘সারপ্লাস প্লুটোনিয়াম ইউটিলাইজেশন প্রোগ্রাম’ (উদ্বৃত্ত প্লুটোনিয়াম ব্যবহার কর্মসূচি)-এ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। অবশ্য এই আলোচনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
এক বিবৃতিতে পারমাণবিক শক্তি বিষয়ক প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইক গফ বলেন, জ্বালানি দপ্তরের এই কর্মসূচি “কোম্পানিগুলোকে বেসরকারি তহবিল সংগ্রহের পরবর্তী স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ বাড়াবে, আমেরিকার রিসাইক্লিং প্রযুক্তিতে উদ্ভাবনের গতি ত্বরান্বিত করবে এবং দেশের পারমাণবিক রেনেসাঁ বা নবজাগরণকে এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতের অর্থায়নের পথ উন্মুক্ত করবে।”
ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে এই সম্ভাব্য প্লুটোনিয়াম চুক্তিটি সফল হলে, তা ছোট মডুলার রিয়্যাক্টর (এসএমআর) নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় অগ্রগতি হবে, যারা বর্তমানে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে এবং অন্যান্য দেশগুলোকেও একই পথ অনুসরণের সুযোগ করে দিতে পারে।
গত সেপ্টেম্বরের এক চিঠিতে ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট সিনেটর এড মার্কি, ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি ডন বেয়ার এবং ক্যালিফোর্নিয়ার জন গ্যারামেন্ডি সতর্ক করে লিখেছিলেন, “বেসরকারি শিল্পের কাছে অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য প্লুটোনিয়াম হস্তান্তর করা হলে তা পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে, যা উগ্রপন্থী রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসীদের হাতেও পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেই বেসামরিক উদ্দেশ্যে প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করে, তবে আমরা অন্য দেশগুলোকে এর ব্যবহার থেকে কার্যকরভাবে নিরুৎসাহিত করতে পারব না।”
যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান বড় এবং পুরনো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর তুলনায়— এই ছোট মডুলার পারমাণবিক রিয়্যাক্টরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও জায়গার প্রয়োজন অনেক কম পড়ে। তাছাড়া কিছু উন্নত পারমাণবিক কোম্পানির পেছনে টেক জায়ান্টগুলোর সমর্থন রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ায়—এই রিয়্যাক্টরগুলোর উৎপাদিত বিদ্যুতের এক বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে। তবে বর্তমানে তাদের প্রধান বাধা বা হলো জ্বালানি সংকট।
প্রচলিত বা সাধারণ রিয়্যাক্টরগুলোর তুলনায় এই উন্নত পারমাণবিক রিয়্যাক্টরগুলোতে অনেক বেশি শক্তি-ঘন এবং উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়। আর ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত পেন্টাগন তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রধান সরবরাহকারী ছিল রাশিয়া।
ওকলোর মতো কোম্পানিগুলো আমেরিকার নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের রিয়্যাক্টরগুলোতে দ্রুত জ্বালানি জোগাতে—মার্কিন প্লুটোনিয়ামের মজুদকে একটি প্রধান উৎস হিসেবে দেখছে। ওকলো ইতিমধ্যে তাদের রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি পরীক্ষা করার জন্য মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের ‘লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি’র সাথে যৌথভাবে কাজ করছে।







