চোরাই পথে আসা মসলার কারণে দেশের বাজারে দরপতন ঘটে চলেছে। বৈধ পথে আমদানিকৃত মসলায় নানামুখী খরচের পড়তা মিলিয়ে যে দাম নির্ধারিত হচ্ছে। বাজারে তার থেকে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে একই মসলা। এই প্রেক্ষিতে বৈধ আমদানিকারকরা চোরাচালানের কাছে মার খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বলতে গেলে, মসলার বাজার বর্তমানে চোরাই মসলার দখলে। এতে করে একদিকে যেমন খাতুনগঞ্জের বৈধ আমদানি দেউলিয়া হবার পথে, অন্যদিকে সরকারও হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব।
এ ব্যাপারে খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক মেসার্স আইমন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ব্যাংকে এলসি খুলে, ডলার প্রিমিয়াম দিয়ে, উচ্চ শুল্ক দিয়ে মসলা আমদানি করছি। একটি পণ্য দেশের বাজারে আনতে যে কস্টিং পড়ে, তার চেয়েও কম দামে বাজারে চোরাই মাল পাওয়া যাচ্ছে। ক্রেতারা সস্তা পেয়ে ওই সব অবৈধ পণ্যই কিনছে। আমাদেরকে হয়ত লোকসান দিয়ে মাল বেচতে হচ্ছে, নয়তো গুদামে মাল রেখে দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি অমর কান্তি দাশ আক্ষেপ করে বলেন, এবার মসলা এসেছেও কম। তবুও বাজার ঠান্ডা। বাজারে মাল শর্ট থাকলে দাম বাড়ার কথা। কিন্তু চলছে তার উল্টো কারবার। বাজারে চোরাই মসলা বেশি। চোরাই মসলার সরকারি ট্যাক্স নেই, ভ্যাট নেই। তাই তারা কম দামে মাল ছাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের তো পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এলসি করার অর্থ জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কস্টিংয়ের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এভাবে লোকসান দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কি সম্ভব?
খাতুনগঞ্জের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ‘এলএমজি’ এলাচ পাইকারি চার হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল ২০০ টাকা বেশি। অপেক্ষাকৃত কম মানের ‘এসএমজি’ এলাচ এখন বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৮০০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল চার হাজার টাকা।
লবঙ্গের দাম কেজি এক হাজার ৩০০ টাকা চলছে। বর্তমানে ভারতীয় জিরা প্রতি কেজি ৫১৫ টাকা এবং আফগান জিরা ৬৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতিকেজি লবঙ্গ এক হাজার ৩০০ টাকা, কালো গোলমরিচ এক হাজার ৩০ টাকা, সাদা গোলমরিচ এক হাজার ২৩০ টাকা, জায়ফল মানভেদে ৮০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা, কাঠবাদাম ও কাজুবাদাম এক হাজার ৩০০ টাকা, সোনালি কিসমিস ৮০০ টাকা এবং লম্বা কিসমিস ৭৯০ টাকা, মেথি ১৩২ টাকা, ধনিয়া ১৬০ টাকা, মৌরি ১৭৫ টাকা এবং দারুচিনি ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে চোরাই পথে পণ্য আসার বিষয়টি স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন। তিনি বলেন, অন্যান্য বন্দর দিয়েও মসলা আসছে এবং সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে প্রশ্ন উঠেছে, বৈধ পথে আমদানি কম হওয়ার পরও বাজারে কোনো সংকট কেন তৈরি হচ্ছে না? বরং দাম কেন পড়তির দিকে? সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান হচ্ছে। চোরাচালানের পণ্যের কস্টিং কম। যার কারণে পণ্যের দামও কম।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১২ ধরনের মসলা আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে রসুন, আদা ও দারুচিনি। জিরার আমদানি হয়েছে দুই হাজার ৭৯৩ টন, লবঙ্গ এক হাজার ২৫৭ টন, এলাচ এক হাজার ৯৮ টন এবং জায়ফল আমদানি হয়েছে ৩৪৬ টন।






