রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত এই আদেশ দেন।
এর আগে সকালে নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মার্মার বাবা উসাইমং মার্মা বাদী হয়ে এ মামলার আবেদন করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ অপেক্ষমাণ রাখার পর বিকেলে আবেদনটি খারিজের সিদ্ধান্ত জানান।
সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী শাহাদাত হোসেন তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৩ ধারা অনুযায়ী মামলাটি খারিজ করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো নালিশি মামলায় বাদী বা সাক্ষীর জবানবন্দি এবং তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করে ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই, তবে তিনি তা খারিজ করে দিতে পারেন। এটি মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে ভিত্তিহীন বা দুর্বল মামলা বাতিলের একটি আইনি প্রক্রিয়া।
বাদীর আবেদনে যাদের আসামি করা হয়েছিল তারা হলেন—বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, এয়ার কমান্ডিং অফিসার মোরশেদ মোহাম্মদ খায়ের উল আফসার, অফিসার কমান্ডিং মেইনটেন্যান্স গ্রুপ ক্যাপ্টেন রিফাত আক্তার জিকু, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির উপদেষ্টা নুরনবী (অব. কর্নেল), মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল মোহাম্মদ জিয়াউল আলম, প্রিন্সিপাল (প্রশাসন) মো. মাসুদ আলম, স্কুল শাখার প্রিন্সিপাল রিফাত নবী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান, রাজউকের ফিল্ড সুপারভাইজার (উত্তরা), শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সিদ্দিক জুবায়ের, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, সাবেক পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
বাদীর এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছিল, আসামিরা রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে নিরাপত্তা বিবেচনা ছাড়াই যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত এফ-৭ যুদ্ধবিমানকে জনবহুল ঢাকা শহরের ওপর প্রশিক্ষণ উড্ডয়নের অনুমতি দেন, যার ফলে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিপুল প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া দুর্ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
আবেদনে আরও বলা হয়, অনুপযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে স্কুল-কলেজ পরিচালনা এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়ার কারণেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় না এনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের চিকিৎসা এবং উদ্ধার কার্যক্রমে অবহেলার কারণে অনেক শিশু স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে।
বাদী উসাইমং মার্মা এজাহারে উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনায় তার ছেলে মৃত্যুবরণ করেন। সাক্ষী আশরাফুল ইসলামের দুই সন্তানও এতে মারা যাওয়ায় তিনি নিঃসন্তান হয়ে গেছেন। এছাড়া সাক্ষী মো. রেজাউল করিম এবং মুহাম্মদ আব্দুল সামাদেরও একটি করে সন্তানের মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনায় প্রায় দুই শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু মারাত্মকভাবে আহত হয়। অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ায় তারা পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, নিহতদের পরিবারকে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা এবং আহতদের নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে তা দেওয়া হয়নি। আসামিরা ব্যক্তিগত ও যৌথভাবে এই ঘটনার জন্য দায়ী বলে বাদী দাবি করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ২৮ জনই ছিলেন শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনায় বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও প্রাণ হারান।






