যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সাতটি ‘গানবোট’ (দ্রুতগামী ছোট নৌযান) লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে সেগুলো ডুবিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা সাতটি ছোট নৌকা বা যেগুলোকে তারা ‘ফাস্ট বোট’ বলে, সেগুলো ধ্বংস করেছি। তাদের আর এটাই অবশিষ্ট ছিল।” মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে এই হামলা চালিয়েছে।
তবে ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে দুটি ছোট মালবাহী জাহাজে আঘাত করেছে, যাতে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তাদের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ সোমবার প্রণালি পার হয়েছে। ইরান এই দাবিকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র তা অস্বীকার করেছে।
সোমবার বিকেলে মেয়ার্স্ক নিশ্চিত করে, তাদের জাহাজ ‘অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স’ শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। জাহাজটি গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে সেখানে আটকে ছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক পাহারায় উপসাগর ত্যাগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী মার্কিন সামরিক পাহারায় জাহাজটি পারস্য উপসাগর ত্যাগ করে।
সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি ‘অ্যাডনক’-এর একটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হয়েছে। একই সময়ে আমিরাত উপকূলে নোঙর করে রাখা দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জাহাজেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের নিক্ষেপ করা ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ৩টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪টি ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ তেল বন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এতে তিনজন আহত হয়েছেন।
আবুধাবি এই আক্রমণকে একটি ‘বিপজ্জনক উস্কানি’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং জানিয়েছে, এর পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার তারা রাখে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক অজ্ঞাত সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো পরিকল্পনা তেহরানের নেই।
এদিকে জাহাজ পরিচালনাকারী বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান মেয়ার্স্ক বিবিসিকে জানিয়েছে, তাদের একটি মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ মার্কিন সামরিক পাহারায় সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে। ট্রাম্প এই উদ্ধার অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির এই ঘটনাগুলো এটিই পরিষ্কার করে যে রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। তিনি ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’কে ‘প্রজেক্ট ডেডলক’ (অচলাবস্থার প্রকল্প) হিসেবে অভিহিত করেন।
মেয়ার্স্ক জানিয়েছে, তাদের বাণিজ্যিক জাহাজটির চলাচল কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে এবং এর সকল কর্মী নিরাপদ ও অক্ষত আছেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর থেকেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। তেহরান এর জবাবে এই জলপথটি বন্ধ করে দেয়।
এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। এর ফলে আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ হয়। তবে এরপরও খুব কম জাহাজই এই প্রণালি পার হওয়ার সাহস করছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে।
আমিরাতের অবকাঠামোতে হামলার ঘটনায় বিশ্বনেতারা কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এই হামলাকে ‘অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষায় যুক্তরাজ্য সব সময় পাশে থাকবে।
ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার খবরের পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দিনের শুরুতে ৫ শতাংশেরও বেশি।
বন্দরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরে অবস্থিত এই বন্দরে আবুধাবির তেলক্ষেত্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আসে। প্রণালিটি অবরুদ্ধ থাকলেও এই বন্দরের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানি করা সম্ভব হয়।
প্রতিবেশী কাতার এই হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি ‘শর্তহীনভাবে খুলে দেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছে।







