দেশে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে এবং রপ্তানি খাতকে সহায়তা দিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) স্কিম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে একটি নীতিগত প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হচ্ছে, যা শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অনুমোদন মিললে দ্রুত সার্কুলার জারি করে স্কিমটি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রস্তাবিত তহবিলের মধ্যে বড় শিল্পখাতে ২০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ১০ হাজার কোটি এবং কৃষিখাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থ স্বল্পমেয়াদি চলতি মূলধন ঋণ হিসেবে ১ থেকে দেড় বছরের জন্য দেওয়া হবে, যাতে বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কোভিড-পরবর্তী সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের নিশ্চিত ক্রয়াদেশ রয়েছে, তাদেরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এই তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নাকি সরকার—কোথা থেকে আসবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের সম্ভাবনাই বেশি। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো ৫-৬ শতাংশ সুদে এই তহবিল পাবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য বেশি হলেও নীতি সুদের হারের নিচে রাখা হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যাংক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ১,২০০টির বেশি বন্ধ বা আংশিক চালু শিল্প ইউনিট শনাক্ত করেছে। বড় ও ছোট ঋণের ভিত্তিতে আলাদা তালিকাও তৈরি করা হয়েছে।
যেসব কারখানার বাজার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালুর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ শর্তে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু সংকটাপন্ন শিল্পগোষ্ঠীকে সীমিত সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ১৪টি ইউনিটের শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে সহায়তা এবং নাসা গ্রুপকে এলসি সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টেকসই ব্যবসায়িক সক্ষমতা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এই সুবিধা দেওয়া উচিত। দীর্ঘমেয়াদে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কার্যকর হবে না।
তাদের মতে, সফলভাবে কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং কর-ভ্যাট আদায়ের মাধ্যমে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি অর্থ সরবরাহ করা হলে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং বিকল্প উৎস থেকে আংশিক অর্থায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে সতর্কতা
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ঘোষিত বড় প্রণোদনা প্যাকেজের একটি অংশ পরবর্তীতে খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় এবার আরও সতর্কতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অনিয়ম বা অর্থপাচারে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সুবিধার বাইরে রাখা হবে এবং তহবিল ব্যবহারে কঠোর নজরদারি থাকবে।







