জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর দেশের ব্যাংকিং খাত, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নতুন সংযোজিত ১৮(ক) ধারা ঘিরেই এই বিতর্কের মূলকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। কারণ, এই ধারার মাধ্যমে সংকটাপন্ন বা একীভূত হওয়া ব্যাংকের পুরনো শেয়ারধারীদের নির্দিষ্ট শর্তে পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে—যা একদিকে ‘পুনর্গঠন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, অপরদিকে ‘দায়মুক্তির ঝুঁকি’ হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিবর্তনকে অর্থনীতির বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে একটি “নতুন সুযোগের জানালা” হিসেবে তুলে ধরলেও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন— এটি ব্যাংক খাতে জবাবদিহির ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।
অধ্যাদেশ থেকে আইনে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় আনা ব্যাংক রেজুলেশন বিলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো— পুরোনো শেয়ারধারী কিংবা নতুন উপযুক্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা। অধ্যাদেশে যেখানে এমন কোনও সুযোগ ছিল না, সেখানে নতুন বিলে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করায় নীতিগত দিক থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
এছাড়া বিলে স্বেচ্ছা অবসায়ন সংক্রান্ত পৃথক অধ্যায়টি বাতিল বা কাটছাঁট করা হয়েছে। আমানত বিমা আইনের উল্লেখের পরিবর্তে যুক্ত করা হয়েছে নতুন আমানত সুরক্ষা আইনের রেফারেন্সে। পাশাপাশি, বেশ কয়েকটি ধারায় কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস আনা হয়েছে— যা পুরো আইনের বিন্যাসকে আরও সংহত ও পুনর্গঠিত করেছে।
সংখ্যাগত দিক থেকেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ মোট ৯৮টি ধারা থাকলেও সংসদে পাস হওয়া বিলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৫টিতে। তবে এটি শুধু ধারার সংখ্যা কমার বিষয় নয়; বরং এই পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আইনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনও যুক্ত হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন হলো নতুন ১৮(ক) ধারা। অধ্যাদেশে ১৮ ধারার পর সরাসরি ১৯ ধারা ছিল, যেখানে আদালতের কার্যক্রম স্থগিতকরণের বিধান রাখা হয়েছিল। নতুন বিলে ১৮ ধারার বিষয়বস্তু অপরিবর্তিত রেখে তার পরেই সংযোজন করা হয়েছে ১৮(ক) ধারা, যা আইনের কাঠামো ও প্রয়োগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ স্পষ্টভাবে বলা ছিল, কোনও ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরবর্তীতে সব অর্থ ফেরত দিলেও তাদের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না। তবে সেই কঠোর বিধান থেকে সরে এসে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’, যেখানে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত শিথিল করা হয়েছে।
নতুন আইনের ফলে একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার ক্ষেত্রে আগের শেয়ারহোল্ডারদের আর আইনি বাধা থাকছে না। এর মাধ্যমে আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ও নাসা গ্রুপের মতো পূর্বতন নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষগুলোর জন্যও পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই পাঁচ ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব ছিল এসব গোষ্ঠীর হাতে।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশ সংশোধন করে প্রণীত নতুন আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনও তফসিলি ব্যাংক রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় গেলে তালিকাভুক্তির আগের শেয়ারধারী অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবে।
তবে এই সুযোগ সম্পূর্ণ শর্তসাপেক্ষ। আবেদনকারীকে একটি বিস্তারিত অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে— সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব আর্থিক সহায়তা পরিশোধ, নতুন মূলধন বিনিয়োগ, বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ, আমানতকারী ও পাওনাদারের সকল দায় পরিশোধ, কর ও রাজস্ব পরিশোধ, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ব্যাংকের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালী করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।
বিলটি পাসের সময়ই নতুন করে সংযোজিত ১৮(ক) ধারা নিয়ে আপত্তি জানায় বিরোধী দল। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই আপত্তি টেকেনি। এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য বিনিময়ও হয়, যা অধিবেশনে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার শেষ দিনে শুক্রবার (১০ এপিল) একগুচ্ছ অধ্যাদেশ বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। এর মাধ্যমে সেগুলোকে স্থায়ী আইনে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ব্যাংক রেজুলেশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এর আওতায় প্রশাসক নিয়োগ, দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ, ব্রিজ ব্যাংক গঠন, সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, প্রয়োজনে অবসায়ন।
এদিকে ব্যাংকপাড়া এখন সরগরম একীভূত পাঁচ ব্যাংককে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে যে এসব ব্যাংকের আগের মালিকদের আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে এ নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন ও বিতর্ক চলছে।
এ ধরনের আলোচনার প্রভাব ব্যাংকিং খাতেও স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকটির নির্ধারিত বোর্ড সভা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে যে আজকের জন্য নির্ধারিত বোর্ড সভাটি বাতিল করা হতে পারে—এমন গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফলে একীভূত ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ কাঠামো ও মালিকানা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে ব্যাংকপাড়ায়।
সংসদে বিতর্ক: জবাবদিহি বনাম বাস্তবতা
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই বিল ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, দায়ীদের শাস্তির পরিবর্তে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আমানতকারীদের সুরক্ষা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে সরকার বলছে—এটি শাস্তি নয়, বরং বাজারভিত্তিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য— ব্যাংক সচল রাখা, আমানত সুরক্ষা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।
কাঠামোগত পরিবর্তন: কী থাকলো, কী বাদ গেল
বিলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে— মোট ধারা ৯৮ থেকে কমে ৭৫ হয়েছে, স্বেচ্ছা অবসায়নের পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে, ‘ব্যাংক আমানত বিমা আইন, ২০০০’-এর পরিবর্তে ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ যুক্ত হয়েছে, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কাঠামো সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
তবে মূল ক্ষমতা—বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ক্ষমতা অপরিবর্তিত রয়েছে।
সংস্কারের মোড় ঘুরলো কি?
এই বিলের মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকার ব্যাংক খাতে আর্থিক চাপ কমানোর পথ খুঁজছে, অন্যদিকে এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—সংস্কারের লক্ষ্য কি শাস্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নাকি দ্রুত পুনরুদ্ধার?
১৮(ক) ধারা এই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবে এটি সুশাসন জোরদার করবে নাকি পুরোনো অনিয়মকারীদের পুনরুত্থানের সুযোগ দেবে— তা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ, নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
প্রসঙ্গত, গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে দুর্বল ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। এই অধ্যাদেশ এবং বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক— এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় নতুন প্রতিষ্ঠান ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’।
নতুন এ ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের মধ্যে শেয়ার আকারে বণ্টনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে আমানত বিমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রতি গ্রাহককে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পুনঃঅর্থপ্রদান স্কিম ঘোষণা করেছে।
ব্যাংক খাতের এই সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও দুর্বল সুশাসন। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ পাঁচটিসহ একাধিক ব্যাংকে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ উঠে। এসব অনিয়মের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম এস আলম গ্রুপ।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই গ্রুপটি ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির তালিকায় এস আলম গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ও সুশাসন সংকটের গভীরতাকেই সামনে তুলে ধরে।







