টানা চারদিন ব্যাংক বন্ধ। কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অনলাইন অর্থ লেনদেনে কড়া নজরদারি। নির্বাচনকেন্দ্রিক ভোট কেনা-বেচায় সার্বক্ষণিক সতর্কতা। কিন্তু তাতে কি! সারাদেশে এখন নগদ টাকার ছড়াছড়ি। বিশেষ করে প্রার্থীদের লাগামহীন অর্থব্যয়ে কয়েকদিনের জন্য চাঙ্গা গরিবের অর্থনীতি। প্রিন্টিং প্রেসগুলোয় রাতদিন চলছে ব্যানার-পোস্টার-লিফলেট ছাপার কাজ। জনসভায় অংশগ্রহণ, মিছিলে স্লোগান দান, রাজপথে লিফলেট বিতরণ, ঘরে ঘরে ভোটার কার্ড বিলি, রাস্তায় ব্যানার-পোস্টার সাঁটানোর মতো মৌসুমি পেশায় মিলছে উচ্চ সম্মানি।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৪ জন। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রয়েছেন কোটিপতি প্রার্থী। ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৯৯ জন। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, একজন প্রার্থী ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। আইন অনুযায়ী প্রার্থীদের খরচ কোনোভাবেই ২৫০ কোটি টাকা ছাড়ানোর কথা নয়। যদিও জনমনে প্রচার আছে, এমন অনেক প্রার্থী আছেন যারা একাই ২৫০ কোটি টাকা খরচ করছেন। মোট ব্যয় ২৫ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও অনেকে দৈনিক ২৫ লাখের বেশি ব্যয় করছেন। আশার দিক হলো, ধনীর পকেটের টাকা এ প্রক্রিয়ায় গরিবের হাতে যাচ্ছে। বাড়ছে কেনাকাটা, বাজার খরচ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রার্থী এবং তাদের কর্মীরা নিজ নিজ ভোটারদের কেন্দ্রে আনার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। নির্বাচনী এলাকার বাইরে বসবাসকারী ভোটারদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকে যাতায়াত ভাড়া এবং হাত খরচের কথা বলে টাকা দিচ্ছেন। আবার নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী ভোটারদের খুশি করাচ্ছেন মিছিল, মিটিং, লিফলেট বিতরণ, ব্যানার সাঁটানো প্রভৃতি কাজের ‘সম্মানি’ দিয়ে। আবার অনেক প্রার্থীর পক্ষ থেকে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে উপহার সামগ্রী।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, রাজধানীর ফকিরের পুলসহ প্রিন্টিং প্রেসসমৃদ্ধ এলাকাগুলোয় এখন রাতদিন কর্মযজ্ঞ চলছে। ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট ছাপার টুংটাং শব্দে মুখর পুরো এলাকা। এবারের নির্বাচনে কাগজের পোস্টারযোগে প্রচারণার সুযোগ না থাকায় কৌশলে কাপড়ে প্রিন্ট করা পোস্টার বানাচ্ছেন প্রার্থীরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, তিন মাস ধরে তাদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। এজন্যে কাজের দর, শ্রমিকের মজুরি সবই মিলছে উচ্চহারে। আবার এসব ব্যানার যারা রাস্তায় টানাচ্ছেন তাদের ভাগ্যেও জুটছে উচ্চ মজুরি।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, নির্বাচনের কারণে টানা তিন মাস রেমিটেন্স প্রবাহ ঊর্ধমুখী। কালো টাকার ছড়াছড়িতে বেড়েছে মূল্যস্ফীতিও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশে মূল্যস্ফীতির হার টানা তিন মাস ধরে বাড়ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরের ধারাবাহিকতায় জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত বছরের মে মাসের পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। এর মাধ্যমে গত ৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখল দেশ। স্বাভাবিক কারণেই ঘটছে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা। এতে করে নির্বাচন ঘিরে যাদের আয় বেড়েছে তারা ভালো থাকলেও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে এ সুযোগ থেকে বঞ্চিতদের জীবনে।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহেও। গত রবিবার একদিনেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা। এর আগে কখনই একদিনে এত টাকা দেশে পাঠাননি তারা। ১০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিটেন্স এসেছে ফেব্রুয়ারি মাসের আট দিনেই। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পাশাপাশি রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে বেশি রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ (৩.১৭ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। যা ছিল গত বছরের জানুয়ারির চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি। আর একক মাসের হিসাবে ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স।
এদিকে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ লেনদেন বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেনে দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকার সীমা আরোপ করেছে। এই সীমা গত রবিবার রাত থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত পর্যন্ত প্রযোজ্য থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই ব্যবস্থা নির্বাচনকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে পি-টু-পি ইন্টারনেট ব্যাংকিং। অর্থাৎ বিকাশ, রকেট, নগদের মতো আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ১ হাজার টাকার বেশি লেনদেন করা যাচ্ছে না। দৈনিক সর্বোচ্চ ১০টি লেনদেন করা যাচ্ছে অর্থাৎ ১০ হাজার টাকার সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এক সার্কুলারে বাংলাদেশে কার্যরত সকল মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অপ্রচলিত খাতের এই অর্থনৈতিক চাঙ্গাভাব সাময়িকভাবে নিম্ন আয়ের মানুষদের আনন্দ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতি বয়ে আনে। কারণ এমন উপার্জন কখনোই উপকারি বিনিয়োগের উৎস হয় না। বিপরীতে দ্রব্যমূল্যে বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজের সামগ্রিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, আমাদের দেশে কোনো পণ্যের দাম একবার বাড়লে সাধারণত তা আর কমে না। অর্থাৎ এক শ্রেণির মুনাফালোভী চলমান আর্থিক ফ্লো থেকে দীর্ঘস্থায়ী লাভবান হওয়ার সুযোগ খুঁজে বের করে।







