ইউএসটিআর প্রকাশিত চুক্তির নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে এসব সরঞ্জাম কেনা সীমিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় দেশটি থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি বাড়াবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কমাতে হবে সরকারকে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি সই হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু (ম্যান মেইড ফাইবার) আমদানি করে তা দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এই বাণিজ্যিক সুবিধার বিপরীতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কেনার এই শর্ত মেনে নিয়েছে বাংলাদেশ। ইউএসটিআর প্রকাশিত চুক্তির নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে এসব সরঞ্জাম কেনা সীমিত করবে। প্রকাশিত কপিতে দেশগুলোর তালিকা না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া খসড়া চুক্তিতে চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি কমানোর কথা উল্লেখ ছিল।
এ ছাড়া এই চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির কথাও বলা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং যাত্রীবাহী বিমান ও এর যন্ত্রাংশ আমদানি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভবিষ্যতে আরও বেশি বিমান কিনবে। সোমবার বাংলাদেশ সময় রাতে ওয়াশিংটনে চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বাণিজ্য চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
সংশোধিত এই শুল্কহার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রধান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রেখেছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের ওপর পাল্টা শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে ২০ শতাংশ, আর ভারত পেয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে ১ শতাংশ কম-১৮ শতাংশ। পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি করে চীন, এরপরই রয়েছে ভিয়েতনাম। এর পরই বাংলাদেশ তৃতীয় আর ভারত রয়েছে চতুর্থ স্থানে। গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পারস্পরিক এই শুল্ক আরোপ করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। এতে রপ্তানিতে চাপ তৈরি হলে শুল্ক কমাতে আলোচনা শুরু করে ঢাকা। নীতি-নির্ধারকেরা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্কের হার (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) ১৫ শতাংশ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব বলেন, প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের কোনো দেশের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করেনি।
তা ছাড়া ভারতের সঙ্গে চূড়ান্ত হওয়া বাণিজ্য চুক্তির কিছুটা প্রভাবও বাংলাদেশের ওপর পড়েছে, যেখানে ভূরাজনৈতিক বিবেচনা থাকতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে। বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, বাণিজ্য উত্তেজনা কমানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে হিসাব দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি দামে তুলা, গম, সয়াবিন, এলএনজিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিষয়ও স্থান পেয়েছে চুক্তিতে। এ ছাড়া ই-কমার্সে ট্যারিফ আরোপ না করা, যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী ইন্টেলেকচুয়াল মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপি) মেনে চলা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে সমর্থন দিতে হবে বাংলাদেশকে।







