বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা আর অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতার বৃত্ত ভেঙে দীর্ঘ আট মাস পর আলোর মুখ দেখল বাংলাদেশের রপ্তানি খাত। এপ্রিল মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় এসেছে প্রায় ৪০১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এপ্রিলে এই আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। টানা পতনের পর এই বড় উল্লম্ফন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান এই খাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রকাশিত রপ্তানি আয়ের তথ্যে দেখা যায়, গত মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩১৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় ৩১.২১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নিট পোশাক থেকে ১৭০ কোটি এবং ওভেন পোশাক থেকে ১৪২ কোটি ডলার আয় হয়েছে। পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, কৃষি পণ্য এবং ওষধি পণ্যের রপ্তানিতেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১০০ শতাংশের বেশি, যা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় রপ্তানি সক্ষমতারই প্রমাণ।
এপ্রিলের আয় রপ্তানিকারকদের মুখে হাসি ফোটালেও অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্র এখনো কিছুটা ম্লান। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) হিসাবে রপ্তানি আয়ে ২ শতাংশের বেশি নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই দশ মাসে আয় কমেছে প্রায় ৮১ কোটি ডলার। মূলত আগস্ট মাস থেকে শুরু হওয়া টানা পতনের ধাক্কা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এপ্রিলের এই ইতিবাচক ধারা আগামী মাসগুলোতেও বজায় থাকলে বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ সুগম হবে।
রপ্তানি আয়ের এই বড় প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে দুটি প্রধান কারণ দেখছেন উদ্যোক্তারা। প্রথমত, এপ্রিল মাস ছিল পোশাক রপ্তানির ‘ভরা মৌসুম’, ফলে বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা ছিল ব্যাপক। দ্বিতীয়ত, গত বছরের এপ্রিলে ঈদুল ফিতরের কারণে কারখানাগুলোতে দীর্ঘ ছুটি ছিল, যার ফলে উৎপাদন ও রপ্তানি অনেক কম হয়েছিল। গত বছরের সেই নিম্ন আয়ের তুলনায় এবারের প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখাচ্ছে। তবে মে মাসে আবার কোরবানির ঈদের ছুটি থাকায় রপ্তানি আয় কিছুটা ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পণ্যে মার্কিন শুল্ক ২০ শতাংশে নেমে আসায় এবং চীন ও ভারতের ওপর উচ্চ হারে পাল্টাশুল্ক আরোপ হওয়ায় ক্রয়াদেশ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বৈশ্বিক যুদ্ধের ধাক্কা এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই এখন প্রধান কাজ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্ধারিত ৫৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সামনের মাসগুলোতে রপ্তানির এই উচ্চ ধারা বজায় রাখা অপরিহার্য।







